প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ২, ২০২৬, ১:১১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ১, ২০২৬, ১০:১৮ অপরাহ্ণ
![]()
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার চরাঞ্চল খ্যাত আলাতুলি ও শাজাহানপুর অন্চলে কৃষির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে চিনাবাদাম চাষের মাধ্যমে। দীর্ঘদিন অবহেলিত ও পতিত পড়ে থাকা চরজমিগুলো এখন পরিণত হয়েছে সবুজে ভরা উৎপাদন ক্ষেত্র হিসেবে। কৃষি বিভাগের উদ্যোগে বাস্তবায়িত আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পের ফলে এই অঞ্চলের কৃষকদের জীবনে দেখা দিয়েছে আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন।
‘চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (প্রথম সংশোধিত)’-এর আওতায় দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলের মতো চাঁপাইনবাবগঞ্জেও কৃষির আধুনিকায়ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সদর উপজেলার অন্তত ৮টি চরবেষ্টিত ইউনিয়নে এই প্রকল্পের কার্যক্রম ইতোমধ্যে বাস্তব প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
বিশেষ করে আলাতলি ও শাহজাহানপুর ইউনিয়নের রাণীনগর ও হাকিমপুর ব্লকের জেগে ওঠা চরে প্রায় ৬০০ বিঘা জমিতে চিনাবাদাম চাষ করা হয়েছে। আগে যেখানে বছরের পর বছর জমি অনাবাদি পড়ে থাকত, সেখানে এখন কৃষকেরা নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সুনাইন বিন জামান জানান, গত বছর সীমিত পরিসরে প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে চিনাবাদামের পরীক্ষামূলক চাষ করা হয়। সফলতা পাওয়ায় চলতি মৌসুমে তা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়ে বিস্তৃত হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ মো. জিয়াউর রহমানের তত্ত্বাবধানে ২৪ জন কৃষককে নিয়ে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে, যা অন্য কৃষকদের জন্য উৎসাহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)-এর কারিগরি সহায়তায় নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও পরামর্শের ফলে এ বছর নতুন করে প্রায় ৫০০ বিঘা পতিত জমিতে চিনাবাদাম চাষ শুরু হয়েছে।
কৃষি বিভাগ আশা করছে, অনুকূল আবহাওয়া থাকলে এ বছর প্রায় ৪ হাজার ৮০০ মণ চিনাবাদাম উৎপাদন সম্ভব হবে। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উৎপাদন শুধু স্থানীয় চাহিদা পূরণেই সহায়ক হবে না, বরং চরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামোতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
রাণীনগর চরের কৃষক মিলন আলী জানান, গত বছর ১৫ বিঘা জমিতে চিনাবাদাম চাষ করে লাভবান হওয়ায় এবার তিনি আবাদ বাড়িয়ে ৩০ বিঘায় নিয়েছেন।
তার ভাষায়, কৃষি বিভাগের সহায়তা না পেলে এত বড় পরিসরে চাষ সম্ভব হতো না। এখন ভালো ফলনের আশা করছি।
একইভাবে ফরিদ উদ্দীন, সেন্টু ও শামীমসহ অনেক কৃষকই এই ফসলের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধির স্বপ্ন দেখছেন। তারা মনে করছেন, চরাঞ্চলের অনাবাদি জমি কাজে লাগানোর এটি একটি কার্যকর উপায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. মো. ইয়াছিন আলী বলেন, চরাঞ্চলের পতিত জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনা এবং শস্য নিবিড়তা বাড়ানোই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
তিনি আরও জানান, “চিনাবাদাম চাষ ইতোমধ্যে কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এটি লাভজনক বিকল্প ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। ভবিষ্যতে আধুনিক প্রযুক্তির আরও বিস্তারের মাধ্যমে এই সাফল্য আরও সম্প্রসারিত করা হবে।”
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চরাঞ্চলের এই কৃষি সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন নিয়মিত প্রযুক্তিগত সহায়তা, বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনের ঝুঁকি থাকলেও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে এই অঞ্চল দেশের কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলে চিনাবাদাম চাষের বিস্তার শুধু একটি ফসলের গল্প নয়, বরং এটি সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে কৃষকদের জীবনে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তা আগামী দিনে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের শক্ত ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।