প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ২, ২০২৬, ২:০৪ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ১, ২০২৬, ১০:২৬ অপরাহ্ণ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলে চলতি বোরো মৌসুমে তীব্র জ্বালানি সংকট ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট মিলিয়ে সেচ ব্যবস্থায় ভয়াবহ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান চাষ এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। মাঠজুড়ে সবুজ ধানের বদলে দেখা দিচ্ছে অনিশ্চয়তার ছায়া, কৃষকের চোখে ভর করছে হতাশা ও উদ্বেগ।
সরেজমিনে নারায়ণপুর, পার্বতীপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ জমিই নির্ভর করছে ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক তেল সংকটের কারণে অনেক পাম্প বন্ধ হয়ে পড়েছে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না তেল, আবার কোথাও সীমিত সরবরাহ। বাধ্য হয়ে কৃষকরা খোলা বাজার থেকে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি কিনছেন, এতে সেচ ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। সময়মতো পানি না পাওয়ায় অনেক জমিতে ধানের চারা শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
নাচোল উপজেলার কৃষক রয়েল বলেন, পাম্পে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছি না। বিদ্যুৎও থাকে না। পানি দিতে না পারায় ধান শুকিয়ে যাচ্ছে।” একই এলাকার মাসুদ হাসান জানান, পুকুরে পানি আছে, কিন্তু তেল আর বিদ্যুৎ না থাকলে সেচ দেব কীভাবে? কৃষক হাবিবুর রহমানের ভাষায়, বোরো চাষ ৮০ শতাংশ সেচনির্ভর, একটু দেরি মানেই বড় ক্ষতি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় প্রায় ৪৭ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার বড় অংশই সেচনির্ভর। জেলায় মোট ২ হাজার ৩৯৪টি পাম্পের মধ্যে ১ হাজার ৮৩৬টিই ডিজেলচালিত। ফলে জ্বালানি সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাতও সরাসরি ফসল উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।
কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি কার্ডের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহের সরকারি উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে অনেক প্রান্তিক কৃষক সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। বরং সার-বীজের উচ্চমূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি সেচ খরচ, যা চাষাবাদকে লোকসানের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এদিকে, বাড়তি গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে এলাকাভেদে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে, যা সেচ কার্যক্রমকে আরও ব্যাহত করছে।
নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজির হোসেন বলেন, তেল সংকটের কারণে চরাঞ্চলের কৃষকরা খুবই বিপদের মধ্যে আছেন। দ্রুত সমাধান না হলে বড় ধরনের ক্ষতি হবে, বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বিকল্প ব্যবস্থায় সেচ সচল রাখার চেষ্টা চলছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, সমস্যা এখনো কাটেনি।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বোরো মৌসুমে সেচে সামান্য ব্যাঘাতও ফলন বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অস্থিরতা এবং আমদানিনির্ভরতা এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ফলে এটি শুধু কৃষকের সমস্যা নয়, বরং সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেচ মৌসুমে কৃষিখাতে বিদ্যুৎ সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে ডিজেল সরবরাহে কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করে কৃষকদের জন্য সহজলভ্যতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়ছেন কৃষকরা। তাদের একটাই দাবি, সময়মতো পানি। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শুধু কৃষকের ঘাম নয়, জেলার খাদ্য নিরাপত্তাও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।