চাঁপাইনবাবগঞ্জে রাতের আঁধারে সংঘবদ্ধ চক্র খুলে নিচ্ছে ট্রান্সফরমার, তুলে নিচ্ছে সেচ পাম্প। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার শাজাহানপুর ইউনিয়নের মাঠে গেল তিন মাসে অন্তত শতাধিক পাম্প ও ট্রান্সফরমার চুরিরর ঘটনা ঘটেছে। ফলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সেচ কার্যক্রম।
সেচ বন্ধ থাকায় শুকিয়ে যাচ্ছে জমি, ব্যাহত হচ্ছে বোরো ধানের উৎপাদন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার চুরির ঘটনা ঘটলেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। এমনকি পল্লীবিদ্যুত ও থানায় অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার মিলছে না। ফলে বাধ্য হয়ে আগামীতে বিকল্প ফসল উৎপাদনের কথা ভাবছেন কৃষকরা। তাদের দাবি-পাম্প চুরি বন্ধ না হলে প্রায় ২০০০ হাজার বিঘা জমির ধান শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাবে। আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন-চুরি ঠেকাতে নেয়া হচ্ছে কার্যকর ব্যবস্থা।
যতদুর চোখ যায় বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে দেখা যায় সবুজ ধানক্ষেত। এসব ধান গাছে আর কয়দিন পরেই ফুটবে শীষ। কিন্তু এরিই মধ্যে ঘটছে বিপত্তি। প্রায় দিনই ঘরের তালা কেটে চুরি হচ্ছে পানির পাম্প ও বৈদ্যতিক ট্রান্সফরমার। চুরি ঠেকাতে পাহারা দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না চোর চক্রকে। ফলে বাধ্য হয়ে ফসল উৎপাদনে ধার দেনা ও এনজিও থেকে অর্থ নিয়ে আবারও সচল করা হচ্ছে সেচ যন্ত্র। কৃষকদের অভিযোগ মটার ও ট্রান্সফরমার চুরিতে হাত রয়েছে পল্লীবিদ্যুতের কর্মীদের। ক্ষিপ্ত হয়ে চোর ধরিয়ে দিতে কৃষকরায় ঘোষণা করছে লাখ টাকা পুরুষ্কার।
শাজাহান ইউনিয়নের কৃষক ডালিম মিয়া বলেন, প্রায় প্রতি রাতেই আতঙ্ক নিয়ে থাকতে হয়। কখন যে পাম্প বা ট্রান্সফরমার চুরি হয়ে যায়, বুঝতেই পারি না। অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে সেচ যন্ত্র বসিয়েছি, কিন্তু বারবার চুরি হওয়ায় আমরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি।
তিনি আরো বলেন, সেচ বন্ধ থাকায় জমির ধান শুকিয়ে যাচ্ছে। এই মৌসুমে যদি পানি না দিতে পারি, তাহলে পুরো ফসলই নষ্ট হয়ে যাবে। আমরা কৃষকরা এখন দিশেহারা।
একই এলাকার কৃষক বাবুল বলেন, চোরদের ভয়ে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছি, তবুও কোনো লাভ হচ্ছে না। সংঘবদ্ধ চক্র হওয়ায় তারা খুব পরিকল্পিতভাবে চুরি করছে। প্রশাসনের আরও কঠোর পদক্ষেপ দরকার।
তিনি আরো বলেন, একবার পাম্প চুরি গেলে নতুন করে কিনতে আমাদের ঋণ নিতে হচ্ছে। এনজিও থেকে ধার নিয়ে আবার সেচ চালু করছি, কিন্তু এইভাবে কতদিন চলবে?
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার হাওলাদার মো.ফজলুর রহমান বলেন,“চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ট্রান্সফরমার ও সেচ পাম্প চুরির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। এ ধরনের ঘটনা দুঃখজনক এবং এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পল্লীবিদ্যুতের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করা হচ্ছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে চুরি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আমরা গ্রাহকদেরও অনুরোধ করছি—রাতের বেলায় সেচ যন্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং কোনো সন্দেহজনক কিছু দেখলে দ্রুত আমাদের বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে।
কৃষকদের পক্ষ থেকে আমাদের কিছু কর্মচারীর সম্পৃক্ততার যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। যদি তদন্তে কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে—এ ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে আছি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ট্রান্সফরমার ও সেচ পাম্প চুরির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। তবে এখন পর্যন্ত থানায় এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ আমরা পাইনি। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ধরনের চুরি প্রতিরোধে পুলিশের টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকার সম্ভাবনা থাকায় আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছি।
কৃষকদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে—যে কোনো চুরির ঘটনা ঘটলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় অভিযোগ জানান এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করুন। এতে করে অপরাধীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা সহজ হবে।