আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু হয়েছে আম মৌসুমের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। বাগানে বাগানে ঝুলছে পরিপক্কতার পথে থাকা আম, আর সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহেই বাজারে উঠতে যাচ্ছে মৌসুমের প্রথম দিকের আম।
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঘুরে দেখা গেছে, আম পাড়া ও বাজারজাতকরণকে কেন্দ্র করে এখন চাষি ও ব্যবসায়ীদের মাঝে ব্যস্ততা তুঙ্গে। বাগানের ভেতরে তৈরি করা হচ্ছে অস্থায়ী ঘর, সাজিয়ে রাখা হচ্ছে ঝুড়ি ও পরিবহন সরঞ্জাম। শ্রমিকরা গাছের আম পরিচর্যায় শেষ সময়ের কাজ করছেন, যাতে বাজারে উন্নতমানের ফল সরবরাহ করা যায়।
একই সঙ্গে বাগান পরিচর্যা, শ্রমিক নিয়োগ, প্যাকেজিং ও পরিবহন প্রস্তুতিতেও চলছে জোরদার কার্যক্রম। আম সংগ্রহের আগে গাছ পরিষ্কার, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং ফলের মান ঠিক রাখতে নেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় যত্ন। অনেক এলাকায় ইতোমধ্যেই স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী গুদাম ও বাছাই কেন্দ্র, যাতে দ্রুত ও সুশৃঙ্খলভাবে আম বাজারজাত করা যায়।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই গোপালভোগ জাতের আম বাজারে আসতে শুরু করে। এর সঙ্গে গুটি ও মহানন্দা জাতের আমও পাওয়া যায়। চলতি বছরেও একই সময়ের মধ্যেই আম বাজারে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে কিছুটা দেরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও তাপমাত্রার পরিবর্তন আম পাকতে প্রভাব ফেলছে।
আম সংগ্রহের আগে বাগানগুলোতে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। শুকনো গুটি ও পাতা ঝরিয়ে ফেলা হচ্ছে, যাতে আমে পচন না ধরে এবং রং ভালো থাকে।
চাষিরা জানান, মৌসুম শুরু হলেই একসঙ্গে অনেক বাগানে আম পাড়ার কাজ শুরু হবে। এতে শ্রমিকের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগেভাগেই শ্রমিক ঠিক করতে না পারলে ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে চাষিদের।
চাষিরা বলছেন, এ বছর অনেক গাছে তুলনামূলক কম আম ধরেছে, যা ‘অফ ইয়ার’-এর প্রভাব। তবুও বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় ভালো দাম পাওয়ার আশায় রয়েছেন তারা।
এক বাগান মালিক জানান, “গোপালভোগ আম পাড়তে আর ১০-১৫ দিন সময় লাগবে। মাসের শেষ দিকে বাজারে তুলতে পারবো বলে আশা করছি।”
অপরিপক্ক আম যেন বাজারে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন বিশেষ নজরদারি চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। চলতি বছর নির্দিষ্ট আম ক্যালেন্ডার ঘোষণা না হলেও বাজার তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আম পরিপক্ক হওয়ার আগে তা সংগ্রহ না করতে চাষিদের সচেতন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের ভালো মানের আম পাওয়ার জন্য কিছুটা সময় অপেক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতি বছরই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আগাম আম বাজারে এনে বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করেন। এতে একদিকে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে জেলার আমের সুনাম নষ্ট হয়।
এই পরিস্থিতি রোধে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ এ বছর কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের আগে কোনো আম পাড়া বা বাজারজাত করা যাবে না। এ লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে বিশেষ টিম কাজ করবে বলে জানা গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ পরিচালক ড. ইয়াছিন আলী জানান হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করে আম শিল্পের ন ওপর। চলতি মৌসুমে প্রায় ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে চার লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন।
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আন্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকতা ডঃ শরফ উদ্দিন জানান চলতি মৌসুমে ভালো মুকুল এসেছিল তবে মহা নামক ব্যাকটেরিয়ায় শেষ ভাগের মুকুল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাগানে এর প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়াও কালবৈশাখীর তান্ডব ও শিলা বৃষ্টিতে আমের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। এর পরেও বাগানে পর্যাপ্ত আম রয়েছে।
তিনি এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন চলতি মাসের শেষ দিকে বাজারে গোপালভোগসহ আগাম জাতের গুঠি আম বাজারে আসবে। আম বাজারে আসা শুরু হলে জেলার অর্থনীতিতে গতি ফিরবে বলে আশা করছেন তিনি।