হাসপাতালের চিকিৎসক বদলি এবং বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতুতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা-ভ্যানের টোল আদায়কে কেন্দ্র করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এ দুটি ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, কর্মসূচি এবং অবস্থান জেলার রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসকের বদলি এবং মহানন্দা নদীর ওপর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতুতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ভ্যান থেকে টোল আদায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হারুনুর রশীদ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এ দুটি বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন।
গত ১ ও ২ জুলাই বারঘরিয়া এলাকায় টোল প্রত্যাহারের দাবিতে জামায়াত-সমর্থিত বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মী ও চালকরা টানা দুই দিন মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী অবরোধে মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হয় এবং সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
আন্দোলনকারীদের দাবি, নিম্নআয়ের অটোরিকশা ও ভ্যানচালকদের কাছ থেকে টোল আদায় অযৌক্তিক। তারা এসব যানবাহনকে টোলমুক্ত ঘোষণার দাবি জানান।
টোলবিরোধী আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. মাওলানা কেরামত আলী আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বলেন, প্রান্তিক চালকদের কাছ থেকে টোল আদায় জনস্বার্থবিরোধী এবং এটি প্রত্যাহার করা উচিত। একই সঙ্গে দলটির নেতারা টোল ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগও তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, ৩ জুলাই জেলা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করে, টোল প্রত্যাহারের দাবির আড়ালে মহাসড়ক অবরোধ করে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা আরও দাবি করেন, কর্মসূচিতে সরকারপ্রধানকে নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে পরদিন বিক্ষোভ মিছিলও অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে হাসপাতাল ইস্যুতে জেলা ২৫০ শয্যা হাসপাতাল পরিদর্শনের পর বিএনপি নেতা হারুনুর রশীদ দাবি করেন, সরকারি হাসপাতালে কর্মরত থেকেও হাসপাতালের সামনে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে মালিকানা (শেয়ার) রেখে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হওয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পাঁচ চিকিৎসককে বদলি করেছে।
তিনি বলেন, সরকারি দায়িত্বে অবহেলা বা নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়নে কোনো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।
এর প্রতিক্রিয়ায় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, হাসপাতালটি স্বাভাবিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছিল। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চিকিৎসকদের বদলি করা হয়েছে। তিনি জানান, বিষয়টি জাতীয় সংসদেও উত্থাপন করেছেন। পরে এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি বলেন, হাসপাতাল নিয়ে কাউকে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করা হবে।
জবাবে হারুনুর রশীদ বলেন, সরকারি হাসপাতালের কোনো চিকিৎসক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে বা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন না করে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতালকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে হাসপাতালের চিকিৎসক বদলি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পৃথক তদন্ত প্রতিবেদন বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। বদলি হওয়া চিকিৎসকদের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে টোল ইস্যুতেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা না দেওয়ায় আন্দোলনকারীদের দাবির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হাসপাতাল ও টোল—এই দুই জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিবর্তে হাসপাতালের সেবার মানোন্নয়ন, টোল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জনভোগান্তি নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।