রেন্দ্রভূমির প্রখর রোদ, আমবাগানের ছায়া আর গাছভর্তি পাকা ফলের সুবাস—সব মিলিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু হয়েছে বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। দেশের ‘আমের রাজধানী’ খ্যাত এ জেলায় বাজারে উঠতে শুরু করেছে মৌসুমের প্রথম দিকের গোপালভোগ, খিরসাপাত ও গুটি আম। তবে আমের মৌসুম শুরু হলেও এখনও পুরোপুরি প্রাণ ফিরে পায়নি জেলার ঐতিহ্যবাহী আম বাজারগুলো।
বর্তমানে মানভেদে গোপালভোগ ও খিরসাপাত আম প্রতি মণ ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা এবং গুটি আম ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় কিছুটা উদ্বেগে রয়েছেন চাষিরা। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে অন্যান্য জেলা থেকে পাইকারদের আগমন বাড়লে আমের সরবরাহ ও বেচাকেনা দুটোই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
আমই চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান অর্থকরী ফসল। জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। এখানে ফজলি, খিরসাপাত, গোপালভোগ, লক্ষ্মণভোগ, ল্যাংড়া, আম্রপালি, আশ্বিনা, বারি-৪ ও গুটি আমসহ প্রায় আড়াইশ’ জাতের আম উৎপাদিত হয়। জেলার আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা পূরণ করে, পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়।
প্রতি বছর আমের মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভিড় করেন। তখন জেলার আম বাজারগুলো হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। জেলা শহরের পুরাতন আম বাজার, কানসাট, রহনপুর ও ভোলাহাটের বাজারগুলোকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে কোটি টাকার বাণিজ্য। এর মধ্যে কানসাট আম বাজারকে জেলার সবচেয়ে বড় আম বাজার হিসেবে ধরা হয়। তবে মৌসুমের শুরুতে সেই চেনা ব্যস্ততা এখনও চোখে পড়ছে না। বর্তমানে বাজারে গোপালভোগ, খিরসাপাত ও গুটি আমের সরবরাহ থাকলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বড় পাইকারদের উপস্থিতি সীমিত। ফলে খুচরা ও পাইকারি—২ বাজারেই বেচাকেনা তুলনামূলক কম।
সদর উপজেলার আম চাষি আব্দুর রাকিব বলেন, ‘এবার মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া ভালো থাকায় প্রচুর মুকুল এসেছিল। পরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কিছু গুটি ঝরে গেলেও ফলন ভালো হয়েছে। বর্তমানে মানভেদে গোপালভোগ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা, খিরসাপাত ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা এবং গুটি আম ৬০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। বেচাকেনা বাড়লে দামও বাড়বে বলে আশা করছি। এ বছর বাগান পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেশি হয়েছে। আমের দাম না বাড়লে খরচ তোলা কঠিন হবে। এ নিয়ে চাষিদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
আরেক আম চাষি কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারের অবস্থা ভালো না। এভাবে দাম থাকলে উৎপাদন খরচই উঠবে না।’
জেলা সদরের পুরাতন আম বাজারের খুচরা বিক্রেতা হাবিবুর রহমান, আহসান আলী, আমিনুর রহমান ও আলম জানান, বাজারে আমের সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। বর্তমানে গোপালভোগ, খিরসাপাত ও গুটি আম পাওয়া যাচ্ছে। তবে বেচাকেনা এখনও জমে ওঠেনি। ঈদের ছুটি শেষে মানুষ কর্মস্থলে ফিরছে। ঈদের সময় কুরিয়ার সার্ভিসও বন্ধ ছিল। কয়েক দিন ধরে আবার চালু হয়েছে। অন্যান্য জেলার পাইকাররা আসতে শুরু করলে বাজারে গতি ফিরবে। আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যে বাজার পুরোপুরি জমে উঠবে এবং দামও কিছুটা বাড়তে পারে।
কানসাট আম আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক উমর ফারুক টিপু বলেন, ‘কানসাট জেলার সবচেয়ে বড় আম বাজার। বর্তমানে গোপালভোগ প্রায় শেষ পর্যায়ে। খিরসাপাত ও গুটি আম বেশি পাওয়া যাচ্ছে। ঈদের ছুটি শেষে বাজারে ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আম ব্যবসায়ীরা আসছেন। পুরোপুরি বাজার জমে উঠতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. ইয়াছিন আলী জানান, এ বছর আম পাড়া ও বাজারজাতকরণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি। আম পরিপক্ব হওয়ার পরই চাষিরা তা বাজারজাত করতে পারবেন। অপরিপক্ব আম যাতে বাজারে না আসে, সেজন্য মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।’
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এ থেকে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাজারে অপেক্ষা শুধু সেই চেনা কোলাহলের। পাইকারদের ভিড়, ট্রাকভর্তি আমের চালান আর জমজমাট বেচাকেনায় আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই জেলার বাজারগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পাবে—এমন প্রত্যাশা চাষি, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সবার।