
বুধবার (১১ মার্চ) দুপুরে নিজের ফেসবুক আইডিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরে চিকিৎসা সহায়তার জন্য জমা পড়া আবেদনপত্রের ফাইলের ছবি প্রকাশ করে তিনি এ বিষয়ে পোস্ট দেন। তার ওই পোস্টে অনেকেই বিভিন্ন রোগ নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামত জানান এবং কেন ক্যান্সার রোগ দিন দিন বাড়ছে সেই বিষয়েও আলোচনা করেন।
পোস্টে ডা. ইফতেখায়রুল ইসলাম লিখেছেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ছয়টি জটিল রোগের জন্য এককালীন ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়, যার মধ্যে ক্যান্সার অন্যতম। উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে আবেদনগুলো সিভিল সার্জন কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে চূড়ান্ত যাচাইয়ের পর জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অনুমোদনের মাধ্যমে অর্থ ছাড় করা হয়।
তিনি আরও লিখেন, দীর্ঘদিন ধরে এ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তিনি একটি বিষয় স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করেছেন। কয়েক বছর আগেও স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের আবেদন বেশি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে ক্যান্সার ও কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীদের আবেদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। তিনি পোস্টে লিখেছেন, ছবিতে যে ফাইলগুলো দেখছেন, এগুলো আমার জেলার একটি ছোট উপজেলা থেকে গত মাসে চূড়ান্ত হওয়া ক্যান্সার রোগীদের আবেদনপত্র। ক্যান্সার ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। যে পরিমাণ ভেজাল খাবার আমরা খাচ্ছি, সামনে খুব কঠিন দিন আসছে।
ডা. ইফতেখায়রুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী ঠাকুরগাঁও সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকার অসুস্থ মানুষ নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করেন। তবে যাচাই-বাছাইয়ের পর অধিকাংশ আবেদনই বাতিল হয়ে যায়। অনেকের ধারণা চিকিৎসার জন্য আবেদন করলেই আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়, কিন্তু বাস্তবে তা নয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তর নির্দিষ্ট ছয়টি জটিল রোগের ক্ষেত্রে এককালীন ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তা দিয়ে থাকে। রোগগুলো হলো, হৃদরোগ, থ্যালাসেমিয়া, লিভার সিরোসিস, ক্যান্সার, স্ট্রোক ও কিডনি ডিজিজ।
তবে এসব রোগে আক্রান্ত হলেই সহায়তা পাওয়া যায় না। যেমন, হৃদরোগের ক্ষেত্রে রোগটি জন্মগত হতে হবে, স্ট্রোকের পর প্যারালাইসিস থাকতে হবে। কিডনি রোগের ক্ষেত্রে রোগীকে অবশ্যই ডায়ালাইসিস নিতে হবে অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে রোগীরা সরকারি এই আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন। উল্লেখিত ছয়টি রোগের বাইরে বর্তমানে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই।
এছাড়াও জেলার প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে সমাজসেবা কার্যক্রম চালু রয়েছে। সেখানে চিকিৎসকের সুপারিশের ভিত্তিতে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নগদ অর্থ দেওয়া না হলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনে সহায়তা করা হয়। প্রতিটি হাসপাতালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক বছর ধরেই জেলায় ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। শুধু ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলাতেই গত মাসে দেড় শতাধিক ক্যান্সার রোগীর আবেদন জমা পড়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তরে, যা এক বছর আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। তিন থেকে চার বছর আগে প্রতি মাসে মাত্র ৫ থেকে ১০ জন ক্যান্সার রোগী আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করতেন। সে হিসেবে বছরে মোট আবেদন সংখ্যা ৮০ থেকে ১০০ জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. ইফতেখায়রুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ক্যান্সারের প্রকোপ ঠাকুরগাঁওয়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। তবে এটি শুধু ঠাকুরগাঁওয়ের চিত্র নয়, পুরো দেশেই ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের সংখ্যা বাড়ছে। অনেক মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা ভাতার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করছেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বর্তমানে ছয়টি জটিল রোগের ক্ষেত্রে এককালীন ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এসব রোগ হলো জন্মগত হৃদরোগ, থ্যালাসেমিয়া, লিভার সিরোসিস, ক্যান্সার, স্ট্রোকের কারণে প্যারালাইসিস এবং কিডনি রোগ।
তিনি আরও বলেন, আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ভেজাল খাদ্য। আমরা প্রতিদিন যে পরিমাণ ভেজাল খাবার গ্রহণ করছি, সেটিই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিষয়টি এখনই গুরুত্ব দিয়ে না ভাবলে সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা. আনিছুর রহমান বলেন, বর্তমানে ক্যান্সার রোগ বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করছে। মানুষের জীবনযাত্রার ধরনে পরিবর্তন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার, পরিবেশ দূষণ এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ দেরিতে রোগ শনাক্ত করায় চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই ক্যান্সার প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
তিনি আরও বলেন, তামাক ও ধূমপান পরিহার করা, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং পরিবেশ দূষণ কমানোর মাধ্যমে ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এজন্য ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিকভাবেও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি।