মুক্তি পেলো ‘আর্ট এক্সপ্রেস’ এর সৌজন্যে জনপ্রিয় সাঁওতালী ব্যান্ড সেঙ্গেল এর মিউজিক ভিডিও ‘বুরু চেতান’। সাঁওতালদের জাতীয় সংগীত খ্যাত “বাংলাদিশাম মজ দিশাম” গানের সূরকার ও গীতিকার রেভা. যোনা মূর্মূ এর সৃষ্টি “বুরু চেতান চেতানতে হইতে লাড়াঃ কান, হইতে লাড়াঃকান হিপিড়ে হিপিড়ে..আনজমপে হো তিরয়ো সাডেকান, হইতে লাড়াঃ কান হিপিড়ে হিপিড়ে” যার বাংলা আভিধানিক অর্থ হল- পাহাড়ের ওপর বাতাসে দোলে ঝিলিকে ঝিলিক, শোন গো ‘বাতাস’ বাাঁশির নিঠুর সূর তোলে। তিনি বলেন- আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে না সময়টা ৭০ দশকে। একবার অফিসের কাজে বান্দরবন জেলার ফারুকপাড়া এলাকাই গিয়েছিলাম। গাড়ি থেকে নেমে দেখি চারিদিকে অনেক পাহাড় এবং সেই পাহাড়ের চুড়্ইা গাছ ও লতা-পাতা বাতাসে দুলছে। বাতাসের ‘শঁ’‘শঁ’ শব্দ বাঁশির সেই মধুর আওয়াজের কথা মনে করে দেয়। ওই চিন্তা থেকেই আমি এই গানটি রচনা করি। বাংলাদেশ বেতার সহ বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠানে গানটি পরিবেশন করলেও “সেঙ্গেল”ব্যান্ড নতুন ভাবে রেকর্ডিং করে, নতুন প্রজন্মের কাছে তুলো ধরার প্রচেষ্টাকে আমি সাধুবাদ জানাই। তারা আমার রচিত গানকে নতুন ভাবে তুলে ধরায় সম্মানিত বোধ করছি। বিভিন্ন সময় গানটি বাংলাদেশ বেতারে গানটি গাওয়া হলেও, নতুন প্রজন্মেও মাঝে নতুন ভাবে গানটি নিয়ে আসছে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সাঁওতালী ব্যান্ড দল “সেঙ্গেল”। তারা মনে করেগানটি ঝুমুর তালের অত্যান্ত শ্রুতিমধূর দেশত্ববোধন গান, যা নতুন প্রজন্মের কাছে সমাদৃত হবে। ব্যান্ডের সদস্যরা বলেন, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ৩৩ টির অধিক জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। যার মধ্যে সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, কোল, মাহলে তথা খেরোয়াল জাতিগোষ্ঠীভুক্ত বৈচিত্রময় জাতিসত্ত্বার বসবাস। এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষের রয়েছে নিজস্ব বৈচিত্রময় ঐতিহ্য ও সংষ্কৃতি। যা বাংলাদেশকে সংষ্কৃাতিকভাবে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এছাড়া সিলেট বিভাগে তথা চা শ্রমিক হিসেবে এই সকল বৈচিত্রময় জাতিসত্বার উপস্থিতি যুগ যুগ থেকে লক্ষ্য করা যায়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে, ৫৪ এর সাধারন নির্বাচনে এমএলএ নির্বাচিত হন সাঁওতাল জীবন মূর্মূ, যা হইতো অনেকেই জানিনা। তাদের জীবনযাপন এবং সংষ্কৃতিক বৈচিত্র আমাদের সমাজ সহ বৃহত্তর পরিসরে উপস্থাপনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এই সকল বিষয়াবলী বিবেচনা করে আমরা এই গানের ভিডিও চিত্র ধারন এর ক্ষেত্রে সিলেট অঞ্চলে বেছে নিয়েছি। আমরা চেষ্টা করেছি সিলেট অঞ্চলে বসবাসরব আদিবাসীদের জীবন চরিত্র ও জীবিকা তুলে ধরার। সেই সাথে পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, চা বাগান সহ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে এই বৈচিত্রময় জাতিসত্বার মানুষের শতবছররের যে নিবিড় সম্পর্কের রয়েছে সেই চিত্রটি গানের মাধম্যে তুলে ধরার। এই গানের প্রধান চরিত্রে আভিনয় করেছেন বাংলাদিশাম সান্তাল কড়া খ্যাত- আগষ্টিন মূর্মূ এবং শিখা ক্লারা টুডু। এছাড়া নৃত্য শিল্পী হিসেবে সিলেট অঞ্চলের স্থানীয় আদিবাসী শিল্পীবৃন্দ। ব্যান্ডে অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে গানটি আপলোড করা হযেছে। গানের প্রধাান চরিত্রে অভিনয় করা আগষ্টিন মূর্মূ তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন “শুরুতেই আমি সেঙ্গেল ব্যান্ড-কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আমাকে এমন একটি সুন্দর কাজের সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য। দীর্ঘ সাত বছর পর পুনরায় তাদের গানে কাজ করতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত। এর আগে “সেঙ্গেল” ব্যান্ডের আরও দুটি গানে অভিনয় করলেও এবারের অভিজ্ঞতাটা একেবারেই অন্যরকম। এই মিউজিক ভিডিওতে দেশপ্রেমের আবহে ভালোবাসার এক চমৎকার গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আমরা শিল্পীরা আমাদের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে, সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং স্থানীয় আদিবাসীদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণ এই গানটিকে এক ভিন্ন মাত্রা ও সার্থকতা দান করেছে। সেইসাথে এই অঞ্চলের মানুষের আতিথীয়তায় আমি মুগ্ধ। আদীবাসী সাঁওতাল সমাজ কল্যাণ পরিষদ, মৌলভীবাজার এর সভাপতি দুলাল হাঁসদা বলেন- আমরা আনন্দিত যে, সেঙ্গেল তাদের গানের ভিডিও চিত্র ধারনের জন্য আমাদের এই অঞ্চলকে বেছে নিয়েছে। আমদের ছেলে মেয়েরা এই গানে অভিনয় করছে, আমাদের গ্রাম ও ঘর-বাড়ির চিত্র ফুটে উঠেছে। আরো ভারোরাগা কাজ করছে সাঁওতালী গানে নিজেদের অঞ্চলকে দেখে। সাধ্যমত সকল সহযোগীতা প্রদানের জন্য এই অঞ্চলের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ। গানে নৃত্যপরিচালনা করেছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় আদিবাসী নৃত্যদল “রাহালা রিমিল” এবং ভিডিওগ্রাফি করে “আর্ট এক্সপ্রেস”। সাঁওতাল ঐতিহ্যবাহী পোশাক-পরিচ্ছেদ এর ক্ষেত্রে সহযোগীতা করছে “সানাম হেরিটেজ”। গানের মিউজিক ভিডিও পৃষ্টপোষকতা করছে- গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র, ত্রিসূল সমাজ কল্যান সংস্থা, এমএইচ এগ্রো ও সান্তালী ক্যানভাস। গানটির মিউজিক প্রোডাকশন করেছে- Shofar Studio. এছাড়া সার্বিক সহযোগীতা প্রদান করছে সিলেট অঞ্চলের স্থানীয় আদীবাসী নেতৃবৃন্দ। সেঙ্গেল ব্যান্ডের সদস্যরা হলেন- রিংকু ইমানূয়েল মার্ডী-ভোকাল, হিমসন কিস্কু- ভোকাল ও গীটার, কামেল মার্ডী- দোতরা ও বাঁশি, শিমুল মার্ডী- মাদল ও ঢোল (ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র), ইলিয়াস মুর্মু-ড্রামস এবং জন হেম্ব্রম-গীটার। এছাড়া সবসময় ব্যান্ডের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে- শ্যামল হেম্ব্রম- বাঁশি, , কাঞ্চন সরেন- কিবোর্ড ও ডেলিয়েন্স সুকমল হাঁসদা- রাহাড় ও টামাক( ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র)। মাদল ও নাগড়া আওয়াজ শোনা গেলেই দুচোখে ভেসে উঠে একদল সাঁওতাল রমনী কোমর বেঁধে কোন এক সুরেলা গানে নাচছে আর তরণেরা হাততালি-বাঁশি বাজিয়ে আনন্দে মেতেছেন তাদের সাথে- এ যেন এক নির্মোহ আনন্দঘন মুহূর্ত। ঠিক এমনি পরিবেশ থেকেই জন্ম সাঁওতালি গানের ব্যান্ড “সেঙ্গেল”। বাংলাদেশে এই সেঙ্গেল ব্যান্ড এখন সাঁওতাল তরুণ-তরুণীসহ প্রবীণদের মনে এক শিহরন জাগানো নাম। সাঁওতাল ঐতিহ্যবাহী রাহাড় ও ঢোলের তালে তাদের কন্ঠে এভাবেই ফুটে উঠুক প্রতিবাদী ও ঐতিহ্যবাহী সাঁওতালী গানের ঝংকার।