কক্সবাজারের উপকূলজুড়ে এখন ‘সাদা সোনা’ খ্যাত লবণের ভরা মৌসুম। উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তপ্ত রোদে লবণ চাষিদের প্রচণ্ড ব্যস্ততা। চাষিদের ঘামে-শ্রমে মাঠজুড়ে লবণের ধবধবে সাদা স্তূপ জমলেও তাদের মুখে হাসি নেই। উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হচ্ছে প্রতি মণ লবণ। ন্যায্যমূল্যের অভাবে চরম হতাশায় দিন কাটছে তাদের।
লবণ চাষিরা জানিয়েছে, প্রতি মণ লবণে লোকসান গুনতে হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা পর্যন্ত। এরই মধ্যে চলতি মৌসুমের চার মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনও লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়নি। সামনে মৌসুমের বাকি আছে মাত্র দুই থেকে আড়াই মাস। এ অবস্থায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কক্সবাজার উপকূলের ৫০ হাজারেরও বেশি লবণ চাষি এবং লবণ চাষের সঙ্গে জড়িত আরও কয়েক লাখ মানুষ।
কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী উপকূলের বাজারপাড়া এলাকার লবণ চাষি জিয়া খান গত বছর তিন কানি জমিতে লবণ চাষ করে প্রায় দেড় লাখ টাকা লোকসান গুনেছেন। চলতি মৌসুমেও একই জমিতে চাষ করছেন তিনি। তবে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটছে তার।
লবণ চাষি একই দুর্দশার কথা বললেন তার পার্শ্ববর্তী লবণ চাষি সিরাজুল ইসলাম (৫৫)। তিনি বলেন, এখন প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৮০ টাকায়। অথচ উৎপাদন খরচই দ্বিগুণ। খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমরা বড় ধরনের লোকসানে পড়ছি।
আরেক চাষি সৈয়দ আলমের (২৮) মতে, টানা দুই বছর লোকসান গুনে এখন তার সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘লবণের দামটা যদি একটু বাড়ত, তাহলে কিছুটা স্বস্তি পেতাম।
চাষি রিয়াদুল হক (৩০) বলেন, উৎপাদন খরচ দিন দিন বাড়ছে। গত বছর এক বান্ডিল ত্রিপলের দাম ছিল প্রায় ৩ হাজার টাকা, এখন তা ৫ হাজার টাকা। শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। তেলও সহজে পাওয়া যায় না। অন্তত ৪০০ টাকা মণ হলে আমরা কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারতাম।
এদিকে চাষিদের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে প্রার্থীরা লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের এক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি এটা কোনো আলোচনাও তুলছেন তারা।
লবণ চাষি নুরুল আলম (৪২) বলেন, আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, লবণ চাষিরা তাদের উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য যাতে পাই । আমাদের একটাই দাবি, লবণের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হোক।
আরেক চাষি রফিকুল ইসলাম (৩৮) বলেন, ‘বাজারে এক প্যাকেট লবণের দাম প্রায় ৪০ টাকা। অথচ আমাদের মাঠের লবণ কিনে নেওয়া হচ্ছে মাত্র ৩ টাকায়। এভাবে চলতে থাকলে আমরা কীভাবে বাঁচব?
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে কক্সবাজার জেলায় ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ চাষ হয়। এতে ২৫ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়েছিল। অপরদিকে, চলতি মৌসুমে ২৭ লাখ ১০ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও চার মাসে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজার টন। এ ছাড়া কত হাজার জমিতে চাষ হচ্ছে সেই তথ্য বিসিকের কর্মকর্তাদের কাছে পাওয়া যায়নি।
এদিকে লবণ চাষি কল্যাণ সমিতির নেতারা বলছেন, বিদেশ থেকে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট’ আমদানির কারণে স্থানীয় বাজারে দাম কমে যাচ্ছে। এতে চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।
জানতে চাইলে কক্সবাজার চেম্বারের সভাপতি ও লবণ চাষি কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা আবদুল শুক্কুর বলেন, ‘কক্সবাজারেই এখন ধবধবে সাদা ও মানসম্মত লবণ উৎপাদন হচ্ছে। তবুও বিদেশি লবণ আমদানির কারণে স্থানীয় চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। তাই দ্রুত লবণ আমদানি বন্ধ করে চাষিদের রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কক্সবাজারস্থ লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, ‘চলতি মৌসুমে চাষিরা মাঠে নামতে কিছুটা দেরি করেছেন। তবে এখন আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পুরোদমে লবণ উৎপাদন চলছে। উৎপাদন বাড়লে লবণের দামও বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।