
রাজশাহী অঞ্চলের আম ব্যবসায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ‘ঢলন’ প্রথা বন্ধ করে কেজি দরে আম কেনাবেচার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমচাষিদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগীয় প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হলে আমচাষিরা তাদের উৎপাদিত আমের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। মঙ্গলবার (৯ জুন) বেলা ১১টায় রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘আমের বিপণন ও বাজারজাতকরণ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সভায়’ সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ।
সভায় রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আমচাষি, ব্যবসায়ী, আড়তদার, বাজার ইজারাদার এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বিশেষ করে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
সভায় জানানো হয়, এতদিন আমচাষিদের কাছ থেকে এক মণ বা ৪০ কেজি আমের দাম পরিশোধ করা হলেও বাস্তবে আড়তদাররা ৫৪ কেজি পর্যন্ত নিতেন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এই ব্যবস্থাকে ‘ঢলন’ বলা হয়। চাষিদের অভিযোগ, এর ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আম বিনা মূল্যে চলে যায় এবং তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে কেজি হিসেবে আম কেনাবেচা করা হবে। এর মধ্য দিয়ে ‘ঢলন’ প্রথার দিন শেষ ঘোষণা করা হলো। একইসঙ্গে আড়তদারদের জন্য প্রতি কেজিতে তিন টাকা কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগের সব জেলায় একই নিয়মে আম বিপণন নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দেশের বৃহত্তম আমের বাজার হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট বাজারের ব্যবসায়ী ওমর আলী বলেন, বর্তমানে বাজারে মণপ্রতি ১০ টাকা এবং ক্যারেটপ্রতি আট টাকা টোল নেওয়া হয়। এ অবস্থায় টোল আদায়ের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানাই।’
কানসাটের আমচাষি আহসান হাবিব বলেন, আম আমাদের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ঢলন প্রথার কারণে চাষিরা প্রতি বছর বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ৫৪ কেজি পর্যন্ত আম নেওয়া হলেও দাম দেওয়া হয় ৪০ কেজির। এতে প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ আম বিনামূল্যে চলে যায়। কানসাট অঞ্চলে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার আম ব্যবসা হয়। ঢলন প্রথার কারণে এর একটি বড় অংশ অতিরিক্তভাবে চলে যায়। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ায় তিনি প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই।
শিবগঞ্জের আমচাষি শামীম হোসেন বলেন, ‘অধিকাংশ আমের হাট সড়কের পাশে বসানো হয়। এতে যানজট সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। নিরাপদ স্থানে বাজার স্থানান্তরের দাবি জানাই।’
আমচাষি সোহেল রানা বলেন, ‘সংরক্ষণ ও পরিবহনের কারণে শতকরা পাঁচ ভাগ পর্যন্ত ওজন কমে যেতে পারে। তাই সীমিত পরিমাণ অতিরিক্ত ওজন গ্রহণ করা যৌক্তিক হলেও এর বেশি নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি সব বাজারে একই ওজন পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানাই।’
সভায় বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ বলেন, ‘আমচাষিরা যেন তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। বহুদিনের ঢলন প্রথা নিয়ে অসন্তোষ ছিল। আজকের সিদ্ধান্তে আমচাষিদের আর্থিক ক্ষতি কমবে এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। রাজশাহী বিভাগের সব জেলায় একই নিয়ম কার্যকর করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
সভা পরিচালনা করেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান। এ সময় বক্তব্য রাখেন, রাজশাহী রেঞ্জের উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ শাহজাহান, রাজশাহী মেট্রোপলিটান পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির, রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী, কৃষি বিপণন অধিদফতর রাজশাহী বিভাগের উপপরিচালক শাহানা আখতার জাহান, ফল গবেষণা কেন্দ্র রাজশাহীর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম, সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের এজিএম মাহমুদুল আলম স্বজল।