
তীব্র তেল সংকটে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলের কৃষকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। চলতি বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ফসল উৎপাদন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা, যা কৃষকদের মধ্যে তৈরি করেছে গভীর উদ্বেগ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চরাঞ্চলের অধিকাংশ জমিতে সেচের জন্য ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেওয়ায় অনেক সেচযন্ত্রই বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, এতে ধানের চারা শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
কৃষকরা জানান, অনেক ফিলিং স্টেশনে তেল পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। এতে বাধ্য হয়ে অনেকেই খোলা বাজার থেকে বেশি দামে তেল কিনছেন। এতে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে, যা তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
চরাঞ্চলের কৃষক আল আমিন বলেন, সেচ বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের সব পরিশ্রম বৃথা যাবে। সরকার যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বো।
তিনি আরো বলেন, দিনরাত কষ্ট করে চাষ করি, কিন্তু এখন তেলের অভাবে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি।
চরাঞ্চলের ধান চাষী নাজমুল হাসান বলেন, তেল না থাকায় সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছি না। ধানের চারা শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি সেচ দিতে না পারি, তাহলে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। তিন আরো বলেন ফিলিং স্টেশনে তেল পাই না, আবার বাইরে কিনতে গেলে অনেক বেশি দাম দিতে হয়। এত খরচ করে চাষ করলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই উঠবে না।”
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি কার্ডের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহের উদ্যোগ থাকলেও প্রান্তিক কৃষকদের অভিযোগ এই সুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে তারা আরও বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব দেশের জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলছে। যেহেতু বাংলাদেশ জ্বালানির বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই এই সংকট সরাসরি কৃষিখাতে প্রভাব ফেলছে।
নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজির হোসেন বলেন, “বর্তমানে তেল সংকটের কারণে আমাদের চরাঞ্চলের কৃষকরা খুবই বিপদের মধ্যে আছেন। সেচের জন্য সময়মতো ডিজেল না পাওয়ায় অনেক জমিতে পানি দেওয়া যাচ্ছে না, ফলে ফসল মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সরকার কৃষকদের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, তবে বাস্তবতা হলো—এই তেল সংকট দ্রুত সমাধান না হলে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ইয়াছিন আলী বলেন, “চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলে চলমান তেল সংকটের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই সময় পানি সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও ফসলের উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। আমরা মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি এবং বিকল্প ব্যবস্থায় সেচ কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছি। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের আতঙ্কিত না হয়ে পরিকল্পিতভাবে সেচ কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানাচ্ছি। আশা করছি, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং কৃষকরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবেন।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলে প্রায় ৩৮ হাজার হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। এর মধ্যে চলতি মৌসুমে প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। সদর উপজেলার নারায়ণপুর চরেই চাষ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















