
একটি প্রতারণা মামলার মিমাংসার অর্ধেক টাকা (৫ (পাঁচ) লক্ষ) হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার এ.এস.আই নজরুলের বিরুদ্ধে। এর সাথে জড়িত রয়েছেন ওই মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা এস. আই নূর ইসলামও। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারী) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে বসে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে মামলার মিমাংসা হয় একটি প্রতারণা মামলার এবং টাকা লেনদেন হয় সদর মডেল থানায়।
মিমাংসার ১০ লক্ষ টাকা ফায়সালা হলেও ৫ লক্ষ টাকা নিয়ে নেন সদর মডেল থানার এ.এস.আই নজরুল। অর্ধেক ৫ লক্ষ টাকা দেন প্রতারণার শিকার ভূক্তভোগী চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের মৃধাপাড়ার মোঃ আব্দুল জলিল কে। শুধু তাই নয়, মামলা রেকর্ড করার নামে ২ দফায় ২০ হাজার টাকা ঘুষও নেন সদর মডেল থানার এ.এস.আই নজরুল। অবশ্য মিমাংসার টাকা থেকে ২ দফায় নেয়া ২০ হাজার টাকা ফেরত দেন এ.এস.আই নজরুল ভূক্তভোগী মোঃ আব্দুল জলিলকে। এনিয়ে ভূক্তভোগীর মনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস.আই হরেন্দ্রনাথ দেবদাশ হলেও বিষয়টির নেতৃত্ব দেন এ.এস.আই নজরুল। পরবর্তীতে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় সদর থানার এস. আই নূর ইসলামকে। কিন্তু তারপরও মামলার সকল কার্যক্রম পরিচালনা করেন নজরুল ইসলাম। এছাড়াও মিমাংসার ৫ লক্ষ টাকা সকলে মিলে ভাগবাটোয়ার করার কথাও মামলার বাদী মোঃ আব্দুল জলিলকে বলেন এ.এস.আই নজরুল। মোটা অংকের টাকা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও একান্ত নিরুপায় হয়ে মিমাংসার অর্ধেক ৫ লক্ষ টাকা নিয়ে বাড়ি আসতে বাধ্য হয়েছেন বলে প্রতিবেদককে জানান মামলার বাদী ভূক্তভোগী মোঃ আব্দুল জলিল। তবে, এসব অভিযোগ অস্বীকার এবং এড়িয়ে কথা বলেন এসব কাজের হোতা বা এ.এস.আই নজরুল এবং জড়িত এস,আই নূর ইসলাম।
জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিমোড় (মৃধাপাড়া) মৃত আফসার আলীর ছেলে মোঃ আব্দুল জলিল (৩২) এর সাথে ‘কানাডা ওয়ার্ক পারমিট ভিসা’ নামক ফেসবুক পেজে’র মাধ্যমে পরিচয় হয় নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার নিত্যই ইউপির আদিয়ারপাড়ার রে রফিকুল ইসলামে ছেলে মোঃ রাজু (৪০) ও মোঃ নাজু (৩৩) এর সাথে। একপর্যায়ে বিদেশ কানাডা পাঠানোর বিষয়ে আলাপ হয় তাদের মধ্যে। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কানাডা পাঠানোর জন্য মোট ১৮ লক্ষ টাকা চুক্তি হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বিভিন্ন মাধ্যমে কয়েক দফায় ১৫ লক্ষ টাকা প্রদান করে বিদেশ পাঠানো এই ২ দালাল রাজু ও নাজু কে। কানাডা পাঠানোর জন্য সি প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্রও জমা দেন আব্দুল জলিল তাদের কাছে। কিন্তু কিছুদিন ভালোভাবে কথা বললেও মোঃ রাজু ও মোঃ নাজু’র দিন দিন কথার সাথে কাজের মিল পাচ্ছিল না বিদেশ যাওয়ার জন্য ১৫ লক্ষ টাকা জমা দেয়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুল জলিল। একপর্যায়ে আব্দুল জলিল বুঝতে পারে প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন। অনেক চেষ্টা করেও টাকা ফেরত বা বিষয়টির কোন সুরাহা করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত মোঃ রাজু ও মোঃ নাজু’র বিরুদ্ধে সদর মডেল থানায় প্রতারণা মামলা দায়ের করতে যান জলিল। মামলা দায়েরের জন্য এ.এস.আই নজরুল প্রথমে ১০ হাজার টাকা নেয়। মামলা করা নিয়ে বেশকিছুদিন ঘোরায় আব্দুল জলিলকে থানায়। মামলা এন্ট্রির জন্য আবারও ১০ হাজার টাকার চাপ দেয় এ.এস.আই নজরুল আব্দুল জলিলকে। বিদেশ – যাওয়ার জন্য ঋণের জালে ফেঁসে যাওয়া জলিল বাধ্য হয়ে আবারও ১০ হাজার টাকা দেয় এ.এস.আই নজরুলকে। শেষে ২০২৬ সালের জানুয়ারী মাসে একটি প্রতারণা মামলা রেকর্ড হয় ভূক্তভোগী আব্দুল জলিলের (মামলা নম্বর-০৭, তারিখ-০৪-০১-২০২৬ইং)।
প্রথমে মামলার তদন্তভার দেয়া হয় এস.আই হরেন্দ্রনাথ দেবদাশ কে। তারপর মামলার আসামী ধরার জন্য এবং টাকা ফেরতের ব্যবস্থার জন্য থানায় ঘুরতে থাকেন ক্ষতিগ্রস্থ ও ভূক্তভোগী আব্দুল জলিল। সদর থানা থেকে বদলি হওয়ায় মামলার তদন্তভার দেয়া হয় সদর থানার এস.আই নূর ইসলাম কে বলে জানিয়েছেন প্রথমে এই মামলার তদন্তক-ারী কর্মকর্তা হরেন্দ্রনাথ দেবদাশ। অবশেষে গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারী/২৬) এ.এস.আই নজরুলের নেতৃত্বে সদর থানা পুলিশের একটি দল প্রতারক মোঃ রাজু ও মোঃ নাজু’কে গ্রেফতারের জন্য যায় কিশোরগঞ্জ এবং মোঃ রাজু ও মোঃ নাজু’কে গ্রেফতার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিয়ে আসে। তারপরই বিষয়টি নিয়ে মিমাংসার জন্য উঠেপড়ে লাগে প্রতারক মোঃ রাজু ও মোঃ নাজু’র পক্ষের লোকজন।
প্রথম পর্যায়ে সদর মডেল থানায় বিষয়টি সমাধানের জন্য বসে উভয় পক্ষের লোকজন। সেখানে এ.এস.আই নজরুল ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নূর ইসলাম মামলার সমঝোতার নেতৃত্ব দেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে বসে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারী) দুপুর ১২টার দিকে মামলার সবশেষ মিমাংসাও হয় এবং সমঝোতা এফিডেভিট স্বাক্ষরিত হয়। বাদীকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১০ লক্ষ টাকা দেয়ার শর্তে মামলাটির সমাধান হয়। কিন্তু সমাধানের ১০ লক্ষ টাকার মধ্যে ৫ লক্ষ টাকা ভূক্তভোগীকে দিয়ে বাকি ৫ লক্ষ টাকা নিয়ে যায় এ.এস.আই নজরুল। নিরুপায় এবং বাধ্য হয়ে ৫ লক্ষ টাকা নিয়ে বাড়ি চলে আসেন ঋনের বোঝা মাথায় নিয়ে বেড়ানো আব্দুল জলিল। পুলিশের সহায়তায় টাকা ফেরত পেয়েও অর্ধেক টাকা হাতে পেয়ে এখনও অনেক টাকা ঋণের বোঝা কাঁধে আব্দুল জলিলের। সমাধানের পুরো টাকাটা হাতে পেলে হয়তো আব্দুল জলিলে ঋনের বোঝা অনেকটায় পরিশোধ হতো। কিন্তু পুলিশের এমন কাজে আফশোষ করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই মোটা অংকের টাকা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া আব্দুল জলিলের।
সমঝোতার সময় থাকা একজন জানান, প্রতারণা মামলার বিষয়টি উভয় পক্ষ বসে সমাধানের কথা হয় সদর মডেল থানায়। সমঝোতা মোতাবেক পুলিশের কাছে ২ দফায় ১০ লক্ষ টাকা জমা দেয় প্রতারণাকারী রাজু ও নাজুর পক্ষের লোকজন। বৃহস্পতিবার জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে বসে সমঝোতা কাগজপত্র স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু সমাধানের কথামতো পাওয়া ১০ লক্ষ টাকার মধ্যে ৫ লক্ষ টাকা ভূক্তভোগীকে দেয়া হয়, আর ৫ লক্ষ টাকা রেখে দেয় পুলিশের এ.এস.আই নজরুল ও নূর ইসলাম।
তিনি ক্ষোভের সাথে আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে পুলিশের কাছে বলতে চাইলে তারা কোন পাত্তা দেয়নি। তিনি বলেন, পুলিশ সহায়তা করে ভূক্তভোগীর টাকা উদ্ধার করে দিয়েছে, সেটা অবশ্যই ভালো কাজ। কিন্তু উদ্ধার হওয়া টাকার অর্ধেক টাকা নিয়ে নিবে একা মোটেও ঠিক করেনি। মামলার বাদী আব্দুল জলিল মামলা খরচ বাবদ ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন, তারপর কিশোরগঞ্জ যাওয়া-আসাসহ প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ করেছেন। তারপরও পুলিশের কর্মকর্তা এমন কাজ করলেন। ভূক্তভোগীর কষ্ট থেকেই গেলো, মধ্যখান থেকে লাভ হলো পুলিশের।
একটি সুত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার এ.এস.আই নজরুল, এ.এস.আই আমিনুল, এস.আই নূর ইসলাম। এই তিনজন মিলে সদর – থানায় একটি গ্রুপ হয়ে কাজ করে থাকেন। সব কাজের হোতা হচ্ছেন এ.এস.আই নজরুল। যেসব এমন মামলা হাতে আসে সদর মডেল থানায়, এসব মামলার সব তদারকি করেন এ.এস.আই নজরুল। অর্থ হাতিয়ে নেয়াসহ । সকল নাটের গুরু হচ্ছেন এ.এস.আই নজরুল। তার সহযোগি সদর মডেল ন থানার এ.এস.আই আমিনুল ও এস.আই নূর ইসলাম। এ.এস.আই নজরুল । থানাকে নিজের কবজায় নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন রামরাজত্ব। আর এ.এস.আই – নজরুলের এসব কাজের সাপোট করে ভাগ বুঝে নিচ্ছেন থানার ওসি বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কিশোরগঞ্জের প্রতারনাকারীর বিরুদ্ধে হওয়া ওই প্রতারণা মামলায় মিমাংসার ১০ লক্ষ টাকার মধ্যে অর্ধেক ৫ লক্ষ টাকা নেয়ার বিষয়ে এ.এস.আই নজরুলের সাথে কথা বললে তিনি জানান, বিদেশ পাঠানোর নামে টাকা নিয়ে প্রতারণা করায় প্রতারককে আটক করে নিয়ে আসি বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারী/২৬)। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারী) উভয়পক্ষের আলোচনায় বিষয়টি সমাধান হয়েছে ১০ লক্ষ টাকায়। মিমাংসার কারণে আটক ব্যক্তির আদালতে জামিন হয়ে যাওয়ার কথা। মিমাংসার অর্ধেক টাকা নেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে ফোন কেটে দেন। এদিকে, বিষয়টি সাংবাদিক জেনে ফেলায় ভূক্তভভোগী আব্দুল জলিল ও তার লোকজনকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া অব্যাহত রেখেছেন ৫ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়া এ.এস.আই নজরুল।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে কথা বললে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস.আই নূর ‘ইসলাম বলেন, মামলাটির প্রথমে দায়িত্ব দেয়া হয় এস.আই হরেন্দ্রনাথ দেবদাশ কে। হরেন্দ্রনাথ দেবদাশ বদলী হওয়ায় আমাকে মামলাটির দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রেক্ষিতে কিশোরগঞ্জ থেকে মামলার আসামী রাজু ও নাজু কে গ্রেফতার করে নিয়ে আসি এবং আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
সমঝোতা বা টাকা লেনদেন বিষয়ে তিনি বলেন, আমি বিষয়টি অবগত নই। আমি আসামী আদালতে সোপর্দ করে দিয়েছি। এর বেশী কিছুই জানা নেই। সমঝোতার ১০ লক্ষ টাকার ৫লক্ষ টাকা পুলিশের কাছে রেখে দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই, বাদীর সাথে কথা বলে জানাতে পারবো বলেন জানান এস.আই নূর ইসলাম। কিন্তু, বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও এস.আই নূর ইসলাম মামলার আসামী গ্রেফতার, সমঝোতা, টাকা লেনদেন এবং অর্ধেক টাকা রেখে দেয়ার সব বিষয় তার উপস্থিতিতেই হয়েছে এবং তিনি সব বিষয় অবগত বলে জানিয়েছেন সমঝোতায় উপস্থিত থাকা ব্যক্তিরা ও বাদী আব্দুল জলিল।
এব্যাপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া মূখপাত্র) এ.এন.এম ওয়াসিম ফিরোজ এর সাথে কথা বললে তিনি বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। যদি এমন কোন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গহণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, জেলা পুলিশের কোন সদস্য অন্যায় বা অপকর্মের সাথে জড়িত থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে
সূত্র : চাঁপাই দর্পণ
নিজস্ব প্রতিবেদক 















