
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আদলে সংঘটিত এক ভয়াবহ প্রতারণার ঘটনা নতুন করে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য চালু হওয়া রাষ্ট্রীয় সহায়তা কর্মসূচিকে পুঁজি করে একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে ‘দুস্থ কার্ড’ তৈরি করে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে আনুমানিক ৮ কোটি টাকা—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে।
ঘটনাটি শুধু একটি প্রতারণা নয়, বরং এর পেছনে কারা রয়েছে—তা নিয়ে এখন শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। স্থানীয়দের দাবি, এটি কোনো একক ব্যক্তির কাজ নয়; বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে এই কার্যক্রম চালিয়েছে।
প্রতারকরা “মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ”—এই আবেগঘন স্লোগান ব্যবহার করে এমন একটি কার্ড তৈরি করে, যা দেখতে প্রায় সরকারি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ডের মতো। ফলে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। অনেকেই মনে করেছেন এটি সরকারের অনুমোদিত প্রকল্প, যেখানে স্বল্পমূল্যে চাল পাওয়া যাবে।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়। গ্রামের দরিদ্র মানুষ, যারা সামান্য সহায়তার আশায় ছিলেন, তারাই হয়ে ওঠেন এই প্রতারণার প্রধান শিকার। কেউ কেউ গরু বিক্রি করে, কেউ ধার করে—এই কার্ড সংগ্রহ করেছেন, শুধুমাত্র স্বল্পমূল্যে খাদ্য পাওয়ার আশায়।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে “মেসার্স মাসকুরা ট্রেডার্স” নামের একটি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় সূত্র বলছে, এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কার্ড বিতরণ, অর্থ সংগ্রহ এবং চাল সরবরাহের নামে পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।
তবে ঘটনাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ভুক্তভোগীদের একটি অংশ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলে। তাদের দাবি, এই কার্যক্রম এত বড় পরিসরে পরিচালিত হলেও প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিদের অগোচরে থাকা সম্ভব নয়। কেউ কেউ বলছেন, চেয়ারম্যানের নীরব সমর্থন বা প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি চাঁপাই জনপদ কে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
এদিকে কার্ডগুলো এতটাই নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে, শুরুতে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও বিভ্রান্তিতে পড়েন। অনেকেই এটিকে সরকারি উদ্যোগ ভেবে বিশ্বাস করেন, যার ফলে প্রতারণার জাল দ্রুত বিস্তৃত হয় এবং হাজার হাজার মানুষ এতে যুক্ত হয়ে পড়ে।
ঘটনার প্রেক্ষিতে গত ৭ এপ্রিল শিবগঞ্জ উপজেলার ধাইনগর ইউনিয়নের জাবড়ী কাজীপাড়া এলাকায় জেলা প্রশাসনের একটি অভিযান পরিচালিত হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অনুজ চন্দের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ও থানা পুলিশ অংশ নেয়।
অভিযান শুরুর আগেই স্থানীয় জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয় প্রশাসনকে। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ—দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতারণা চললেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে তাদের ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
অভিযানে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। “মেসার্স মাসকুরা ট্রেডার্স” নাম ব্যবহার করে একটি বসতঘরেই নিম্নমানের চাল মজুদ রেখে ব্যবসা পরিচালনার প্রমাণ পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দা জেসমিন বেগমের নাম এই ঘটনায় সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, তার নেতৃত্বেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই প্রতারণা পরিচালনা করছিল।
এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তাদের হাতিয়ে নেওয়া অর্থ ফেরতের জোর দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে চেয়ারম্যানসহ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এ ধরনের প্রতারণা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়—এটি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দরিদ্র মানুষের জন্য নেওয়া উদ্যোগগুলো তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 

















