
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শীর্ষ মাদক কারবারিদের একজন এবং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জুয়েল রানা (৩৪) দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। মাদক মামলায় আদালতের সাজাপ্রাপ্ত এই আসামি প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন- এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশ সফর ও ওমরাহ পালনের ছবিও প্রকাশ করেছেন তিনি।
জানা গেছে, জুয়েল রানার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়া গ্রামে। তিনি চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য এবং জেলার তালিকাভুক্ত শীর্ষ পাঁচ মাদক কারবারির একজন। সীমান্তপথে ভারত থেকে হেরোইনের চালান এনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা এবং ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে সাতটি মামলা রয়েছে।
এর মধ্যে গত বছরের ১২ অক্টোবর হেরোইন ও ইয়াবা পাচারের একটি মামলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত জুয়েল রানা ও তার সহযোগী ববিতা খাতুনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। রায় ঘোষণার সময় জুয়েল পলাতক ছিলেন। আদালত তাৎক্ষণিকভাবে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও এখনো তাকে আটক করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এরই মধ্যে গত ৪ ফেব্রুয়ারি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দিয়ে জুয়েল দাবি করেন, “চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশকে আমাকে খুঁজতে কষ্ট করতে হবে না। আগামীকাল আমার মিশন শেষ করে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করব ইনশাল্লাহ।”
তবে ওই ঘোষণার পরও তাকে আত্মসমর্পণ করতে দেখা যায়নি। বরং সম্প্রতি তিনি কাতার হয়ে সৌদি আরবে গিয়ে মক্কায় ওমরাহ পালন করেছেন বলে ফেসবুকে ছবি প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও জুয়েল নিজ এলাকায় প্রকাশ্যে একজন প্রার্থীর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন। এমনকি পুলিশের সামনেই তিনি এলাকায় চলাফেরা করেছেন বলে দাবি করেন তারা। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানা পুলিশ বরাবরই বলছে, তারা জুয়েলের অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর শহরের বালুবাগান এলাকায় অভিযান চালিয়ে জুয়েলের সহযোগী ববিতা খাতুনকে ৭৫০ গ্রাম হেরোইনসহ আটক করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, উদ্ধার হওয়া মাদক জুয়েল রানার। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বেলেপুকুর এলাকায় জুয়েলের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরও ২০০ গ্রাম হেরোইনসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় ডিএনসির উপপরিদর্শক আসাদুর রহমান সদর থানায় মামলা করেন। ওই মামলাতেই পরে আদালত জুয়েলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
তবে গ্রেপ্তারের মাত্র ২৮ দিনের মাথায় গত বছরের ১৩ নভেম্বর জেলার একটি আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হন জুয়েল। সেখানে তাকে ফুল দিয়ে বরণ করা হয় এবং পরে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা ও বোমা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে নিজ এলাকায় ফেরেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসান বলেন, “জুয়েল রানা জেলার শীর্ষ পাঁচ মাদক কারবারির একজন। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সীমান্ত এলাকায় তার বাড়ি এবং বিভিন্ন স্থানে অবস্থান পরিবর্তনের কারণে তাকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পুলিশ বা বিজিবি চাইলে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব।”
ডিএনসি সূত্র আরও জানায়, জুয়েল রানার নামে ৩১টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, “জুয়েল রানাকে ধরতে পুলিশ একাধিক স্থানে অভিযান চালিয়েছে। তবে এখনো তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন- এমন কোনো তথ্য জেলা পুলিশের কাছে নেই।”
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















