পিচ কার্পেটিংয়ের বদলে মাটি দিয়ে সড়ক ঢাকলো ঠিকাদার, ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ

 

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি সড়ক নির্মাণে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আড়াই মিটার প্রসস্থ সড়কের অনেকাংশই ফাঁকা রেখে পিচ কার্পেটিং করার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা। পরে এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে ফাঁকা থাকা সড়ক রাতারাতি মাটি দিয়ে ঢেকে ফেলার সত্যতা মিলেছে। এমনকি পিচ কার্পেটিংয়েও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করার কারনে হাতের টানেই উঠছে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়ক।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নয়াগোলা থেকে মহাডাঙ্গা হয়ে আলীনগর রেলগেইট পর্যন্ত ৫.৩ কিলোমিটার সড়কের পূণ: নির্মাণকাজ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি। পিচ কার্পেটিং ও ব্লক দিয়ে নির্মাণ হওয়া সড়কের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৮৯ লাখ ৪৭ হাজার ৩১১ টাকা।

স্থায়ীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী, পথচারী ও পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, গত সপ্তাহে সড়কটির মহাডাঙ্গা থেকে আলীনগর রেলগেইট পর্যন্ত পিচ কার্পেটিং করা হয়। এতে আড়াই মিটার সড়কের বিভিন্ন অংশ ফাঁকা রেখেই কাজ সম্পন্ন করার অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা। পরে এর কিছু ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। এনিয়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। এমনকি এতে হস্তক্ষেপ করেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-০৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল।

পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরও একটি একটি ভিডিও-তে দেখা যায়, এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল সড়কটির নির্মাণকাজ নিয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলীকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এসময় তিনি সঠিকভাবে নিয়মমাফিক কাজ করার জন্য তাগিদ দেন।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম ভিডিও যাওয়ার পরই তড়িঘড়ি করে পিচ কার্পেটিংয়ের পরেও ফাঁকা থাকা সড়ক ঢাকতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন ঠিকাদার। শুক্রবার (০৩ এপ্রিল) ও ০৪ এপ্রিল (০৪ এপ্রিল) দুদিনে ৮ জন শ্রমিক দিয়ে সড়কের পাশ থেকে মাটি কেটে ফাঁকা রাস্তা পূরণ করা হয়। শনিবার (০৪ এপ্রিল) সরেজমিনে গিয়েও শ্রমিকদের এই কাজ করা অবস্থায় পাওয়া যায়।

অন্যদিকে, মহাডাঙ্গা থেকে আলীনগর রেলগেইটের একাধিক অংশে কাজ শেষের দুদিন পরেও হাতের টানেই পিচ কার্পেটিং উঠতে দেখা যায়। শনিবার (০৪ এপ্রিল) সকালে হাজির মোড় ও মহাডাঙ্গা রেল লাইন সংলগ্ন এলাকায় হাত ও পায়ের চাপে সড়কের পিচ কার্পেটিং উঠায় স্থানীয় তরুণ-যুবকরা।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আলিম বলেন, এলাকার অনেকেই বলাবলি করছে, রাস্তাটি পুলসেরাতের চেয়েও চিকন হয়েছে। সড়কটির একদিকে রেললাইন আরেকটি ডোবা-গর্ত। কিন্তু আগের যেই সড়কটি ছিল সেই পরিমাণ প্রসস্থ করে পিচ কার্পেটিং করা হয়নি। ফলে সড়কটি আরও ছোট হয়ে গেছে। আড়াই মিটার প্রসস্থ সড়কের অনেক জায়গায় ফাঁকা রেখেই শেষ করা হয়েছে।

কলেজছাত্র ইয়াসির আরাফাত জানান, ফাঁকা রেখেই কাজ শেষ করা হলেও এটি নিয়ে যখন আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলো, তখন আবার পাশ থেকে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো। পৌরসভার এলজিইডির কর্মকর্তারা এসব জানার পরেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি। কাজের মান খারাপ দেখে কয়েকজন কাজ বন্ধ করার দাবি তুললেও তা আমরা করতে দেয়নি। কিন্তু মনে হচ্ছে আমাদেরই ভুল হয়েছে।

স্থানীয় এক মুদি দোকানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাস্তার পিচ কার্পেটিং হওয়ার পরেও কিভাবে এক-দুদিন পরেও হাতের চাপে উঠে যায়, তা আমাদের বোধগম্য নয়। ফেসবুকে দেখে এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল নিজে ফোন দিয়ে কাজ সঠিক করার কথা বললেও তা মানা হয়নি, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। কোটি টাকার রাস্তা যদি বাচ্চাদের হাতের চাপেই উঠে যাবে, তাহলে এমন রাস্তা তৈরির কি দরকার ছিল?

শত অভিযোগ থাকার পরেও কাজের মান ঠিক রয়েছে বলে দাবি ঠিকাদার ও নির্বাহী প্রকৌশলীর। ঠিকাদার সেলিম রেজা মুঠোফোনে জানান, কাজের মান সঠিক রয়েছে। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। পাবলিক কে কি বলছে তা দেখার দরকার নেই, আমি ঢাকা থেকে আসলে আপনি নিজে আমাকে উঠিয়ে দেখায়েন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী তৌফিকুল ইসলাম বলেন, সড়কের প্রসস্থতা আড়াই মিটার হলেও পিচ কার্পেটিংয়ের আগেই রোড রোলার চলার সময় প্রস্থ কিছু জায়গায় বেড়ে যায়। তবে আমি নিজে পরিদর্শন গিয়ে ঠিকাদারকে এসব ছেড়ে দেয়া অংশ মেরামত করে দিতে বলেছিলাম। পরে তারা তা করেছে। আমি বিভিন্ন কাজের পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছি, এতে নিম্নমানের কাজের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পিচ কার্পেটিংয়ের কাজও ভালো হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

Categories

পিচ কার্পেটিংয়ের বদলে মাটি দিয়ে সড়ক ঢাকলো ঠিকাদার, ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ

Update Time : ০৩:০৬:১৫ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬

 

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি সড়ক নির্মাণে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আড়াই মিটার প্রসস্থ সড়কের অনেকাংশই ফাঁকা রেখে পিচ কার্পেটিং করার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা। পরে এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে ফাঁকা থাকা সড়ক রাতারাতি মাটি দিয়ে ঢেকে ফেলার সত্যতা মিলেছে। এমনকি পিচ কার্পেটিংয়েও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করার কারনে হাতের টানেই উঠছে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়ক।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নয়াগোলা থেকে মহাডাঙ্গা হয়ে আলীনগর রেলগেইট পর্যন্ত ৫.৩ কিলোমিটার সড়কের পূণ: নির্মাণকাজ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি। পিচ কার্পেটিং ও ব্লক দিয়ে নির্মাণ হওয়া সড়কের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৮৯ লাখ ৪৭ হাজার ৩১১ টাকা।

স্থায়ীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী, পথচারী ও পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, গত সপ্তাহে সড়কটির মহাডাঙ্গা থেকে আলীনগর রেলগেইট পর্যন্ত পিচ কার্পেটিং করা হয়। এতে আড়াই মিটার সড়কের বিভিন্ন অংশ ফাঁকা রেখেই কাজ সম্পন্ন করার অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা। পরে এর কিছু ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। এনিয়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। এমনকি এতে হস্তক্ষেপ করেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-০৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল।

পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরও একটি একটি ভিডিও-তে দেখা যায়, এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল সড়কটির নির্মাণকাজ নিয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলীকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এসময় তিনি সঠিকভাবে নিয়মমাফিক কাজ করার জন্য তাগিদ দেন।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম ভিডিও যাওয়ার পরই তড়িঘড়ি করে পিচ কার্পেটিংয়ের পরেও ফাঁকা থাকা সড়ক ঢাকতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন ঠিকাদার। শুক্রবার (০৩ এপ্রিল) ও ০৪ এপ্রিল (০৪ এপ্রিল) দুদিনে ৮ জন শ্রমিক দিয়ে সড়কের পাশ থেকে মাটি কেটে ফাঁকা রাস্তা পূরণ করা হয়। শনিবার (০৪ এপ্রিল) সরেজমিনে গিয়েও শ্রমিকদের এই কাজ করা অবস্থায় পাওয়া যায়।

অন্যদিকে, মহাডাঙ্গা থেকে আলীনগর রেলগেইটের একাধিক অংশে কাজ শেষের দুদিন পরেও হাতের টানেই পিচ কার্পেটিং উঠতে দেখা যায়। শনিবার (০৪ এপ্রিল) সকালে হাজির মোড় ও মহাডাঙ্গা রেল লাইন সংলগ্ন এলাকায় হাত ও পায়ের চাপে সড়কের পিচ কার্পেটিং উঠায় স্থানীয় তরুণ-যুবকরা।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আলিম বলেন, এলাকার অনেকেই বলাবলি করছে, রাস্তাটি পুলসেরাতের চেয়েও চিকন হয়েছে। সড়কটির একদিকে রেললাইন আরেকটি ডোবা-গর্ত। কিন্তু আগের যেই সড়কটি ছিল সেই পরিমাণ প্রসস্থ করে পিচ কার্পেটিং করা হয়নি। ফলে সড়কটি আরও ছোট হয়ে গেছে। আড়াই মিটার প্রসস্থ সড়কের অনেক জায়গায় ফাঁকা রেখেই শেষ করা হয়েছে।

কলেজছাত্র ইয়াসির আরাফাত জানান, ফাঁকা রেখেই কাজ শেষ করা হলেও এটি নিয়ে যখন আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলো, তখন আবার পাশ থেকে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো। পৌরসভার এলজিইডির কর্মকর্তারা এসব জানার পরেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি। কাজের মান খারাপ দেখে কয়েকজন কাজ বন্ধ করার দাবি তুললেও তা আমরা করতে দেয়নি। কিন্তু মনে হচ্ছে আমাদেরই ভুল হয়েছে।

স্থানীয় এক মুদি দোকানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাস্তার পিচ কার্পেটিং হওয়ার পরেও কিভাবে এক-দুদিন পরেও হাতের চাপে উঠে যায়, তা আমাদের বোধগম্য নয়। ফেসবুকে দেখে এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল নিজে ফোন দিয়ে কাজ সঠিক করার কথা বললেও তা মানা হয়নি, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। কোটি টাকার রাস্তা যদি বাচ্চাদের হাতের চাপেই উঠে যাবে, তাহলে এমন রাস্তা তৈরির কি দরকার ছিল?

শত অভিযোগ থাকার পরেও কাজের মান ঠিক রয়েছে বলে দাবি ঠিকাদার ও নির্বাহী প্রকৌশলীর। ঠিকাদার সেলিম রেজা মুঠোফোনে জানান, কাজের মান সঠিক রয়েছে। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। পাবলিক কে কি বলছে তা দেখার দরকার নেই, আমি ঢাকা থেকে আসলে আপনি নিজে আমাকে উঠিয়ে দেখায়েন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী তৌফিকুল ইসলাম বলেন, সড়কের প্রসস্থতা আড়াই মিটার হলেও পিচ কার্পেটিংয়ের আগেই রোড রোলার চলার সময় প্রস্থ কিছু জায়গায় বেড়ে যায়। তবে আমি নিজে পরিদর্শন গিয়ে ঠিকাদারকে এসব ছেড়ে দেয়া অংশ মেরামত করে দিতে বলেছিলাম। পরে তারা তা করেছে। আমি বিভিন্ন কাজের পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছি, এতে নিম্নমানের কাজের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পিচ কার্পেটিংয়ের কাজও ভালো হয়েছে।