
তরমুজ মানেই গ্রীষ্মকাল, রোদপুড়া দুপুর, আর ঠান্ডা একফালি মিষ্টি ফলের স্বাদ। তবে এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে গ্রীষ্মের সেই তরমুজ দেখা গেল বর্ষাতেই জেলার নাচোল গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট উপজেলার কৃষকরা এবার উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড জাতের মার্সেলো কালো ও হলুদ তরমুজ চাষ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন এই তিন উপজেলার কৃষকরা।
আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সহায়তায় এই বর্ষাকালীন তরমুজ এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিন উপজেলার কৃষকদের মাঝে নতুন সম্ভাবনার উৎস হয়ে উঠেছে।
কৃষি বিভাগের, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প ও (এসএসিপি রেইনস) প্রকল্পের আওতায় গোমস্তাপুর ভোলাহাট ও নাচোল উপজেলার কসবা ইউনিয়নের বহিপাড়ায় শরিফুলের ২৫ শতক জমিতে চাষ করা হচ্ছে কালো তরমুজ। মালচিং ও মাচা পদ্ধতিতে ঝুলছে কালো রঙের লম্বাটে আকৃতির তরমুজ, যা দেখতে যেমন নজরকাড়া, খেতেও সুস্বাদু। এবং প্রতিদিনই আশপাশের এলাকার কৃষকরা ক্ষেত দেখতে আসছেন যা নতুন উদ্যম তৈরি করছে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে।
এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, মার্সেলো জাতটি ভাইরাস সহনশীল এবং মাত্র ৬০–৬৫ দিনের মধ্যেই ফসল তোলা যায়। বর্ষাকালে প্রতিটি তরমুজের গড় ওজন হয় ৩–৫ কেজি। তবে শীতকালে মাটিতে চাষ করলে ফলন আরও বাড়ে। মালচিং পদ্ধতিতে চাষ করলে ফলন ও গুণগত মান দুটোই উন্নত হয়।
তরমুজ চাষী শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রথমে ভেবেছিলাম এত খরচ করে লাভ করা কঠিন হবে। কিন্তু কৃষি অফিসারদের পরামর্শে সাহস পাই। তারা নিয়মিত মাঠে এসে নির্দেশনা দিয়েছেন। এখন জমিতে ফল আসতে শুরু করেছে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই স্থানীয় বাজারে তরমুজ বিক্রি শুরু করব। প্রতি কেজি ৫০ টাকা দরে বিক্রির আশা করছি। যদি দাম ধরে রাখা যায়, তাহলে আমি শুধু খরচই তুলতে পারব না, বাড়তি আয়ও হবে। আমাদের মতো গ্রামের কৃষকদের জন্য এটা বড় আশা। আগে ভাবতাম শুধু মৌসুমেই তরমুজ হয়। এখন বুঝতে পারছি প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এবং আল্লাহ চাইলে অসময়েও সম্ভব। ২৫ শতাংশ জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করেছি, কোনো রাসায়নিক সার বা বালাইনাশক ছাড়াই। পাশাপাশি তিনি উচ্চ ফলনশীল শসাও উৎপাদন করি। তিনি জানান, বাজারে কেজি প্রতি ৫০–৬০ টাকা দাম পেলে এ চাষ তার জন্য লাভজনক হয়ে উঠবে।
চন্দনা গ্রামের আরও কয়েকজন কৃষকরা জানান, মাঠে শফিকুল ইসলামের সাফল্য দেখে তারাও উৎসাহিত হয়েছেন। কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, আমরা এতদিন ধান-গম বা মৌসুমি সবজিতেই সীমাবদ্ধ ছিলাম। কিন্তু এই নতুন চাষ দেখে আমাদেরও ইচ্ছা হচ্ছে। কৃষি বিভাগ যদি পাশে থাকে, আমরাও অসময়ে তরমুজ চাষে নামতে চাই।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল আলিম বলেন, গ্রামে যদি অফসিজন ফসল ফলানো যায়, তাহলে শহর থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসবে। এতে আমরা ভালো দাম পাব, আমাদেরও লাভ হবে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, অসময়ে তরমুজ চাষ কেবল কৃষকের আয়ের নতুন ক্ষেত্র খুলবে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। মাঠে কাজ করছেন স্থানীয় নারী-পুরুষ শ্রমিকরাও। তারা জানান, এ ফসলের কারণে মৌসুমহীন সময়ে তাদের কাজের সুযোগ হয়েছে।
নাচোলের চন্দনা গ্রামে অসময়ে তরমুজ চাষের এ সাফল্য কৃষিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সঠিক পরিচর্যা, সরকারি সহায়তা ও বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে হলে এ উদ্যোগ শিগগিরই বৃহত্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জকে দেশের তরমুজ উৎপাদনে শীর্ষ স্থানে পৌঁছে দিতে পারে। কৃষক শফিকুল ইসলামের হাসি আজ যেন পুরো এলাকার কৃষকদের মুখেও নতুন স্বপ্নের আলো জ্বালিয়েছে
নাচোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সলেহ আকরাম জানান, অসময়ে তরমুজ চাষ একটি লাভজনক উদ্যোগ। “মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে ফসলের গুণগত মান উন্নত হয়েছে। আরডিএডিপি প্রকল্পের আওতায় ২.৫ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। প্রতি বিঘায় প্রায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হবে।” তিনি আরও বলেন, এই তরমুজ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হবে। প্রতি কেজি ৫০ টাকা দরে। “কৃষি বিভাগ এখন গতানুগতিক পদ্ধতির বাইরে এসে আধুনিক, লাভজনক ও বিষমুক্ত কৃষি চর্চায় কৃষকদের উৎসাহিত করছে। মার্সেলো জাতের তরমুজ তারই একটি সফল উদাহরণ। ভবিষ্যতেও এমন উদ্ভাবনী ও লাভজনক ফসল চাষে কৃষি বিভাগের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
অসময়ে তরমুজ চাষ অনেকটাই লাভজনক হওয়ায় আগ্রহী হচ্ছেন অনেকেই। আগামীতে এর চাষ আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এই নতুন জাতের তরমুজ চাষে সফলতা অর্জন করে ভালো দামে বিক্রি করে লাভবান হবেন চাষিরা এমনটাই মনে করেন কৃষিবিদরা।
সিফাত রানা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট 














