শিরোনামঃ
News Title :

দুই শতকের ঐতিহ্যে মহারাজপুর মেলা, তিন শতাব্দীর স্মৃতি বয়ে চলেছে ‘বাইশ পুতুল’ উৎসব

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:০৭:৫১ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
  • ৪৪ Time View

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে উজানের ঢলে ৪৫০ বিঘা ধান ক্ষতির মুখে

চাঁপাইনবাবগঞ্জে শতাব্দীপ্রাচীন লোকজ সংস্কৃতির দুই গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন বারঘেরিয়ার ‘বাইশ পুতুল’ পূজা ও মহারাজপুর মেলা এলাকার সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য ধারাবাহিকতা তুলে ধরে। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ‘বাইশ পুতুল’ উৎসব যেমন তিন শতাব্দীর পুরোনো ইতিহাস বহন করছে, তেমনি ঈদুল ফিতরের পরদিন থেকে শুরু হওয়া মহারাজপুর মেলা প্রায় দুই শতকের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বারঘেরিয়া এলাকায় ব্রিটিশ আমল থেকে ‘বাইশ পুতুল’ মন্দিরকে ঘিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ বছর আগে গোমস্তাপুর উপজেলার শুক্রবাড়ি গ্রামে এই পূজার প্রচলন ছিল। কোনো এক সময় পূজার কাঠামো মহানন্দা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হলে তা ভেসে এসে বারঘেরিয়ায় পৌঁছায়। পরে স্বপ্নে নির্দেশ পেয়ে শুক্রবাড়ির বাসিন্দারা এখানে জমি কিনে পূজার আয়োজন শুরু করেন, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা বাসুদেব চন্দ্রপাল ও প্রভাস কুমার সাহা জানান, পূজাকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে এবং সেখান থেকেই মেলার সূচনা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় দেশ বিভাগের আগেই স্থানীয় মরহুম সদর আহমেদ মিয়া মহারাজপুর এলাকার একটি আমবাগানে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য পৃথকভাবে মেলার আয়োজন শুরু করেন। পরবর্তীতে এই মেলা ঈদুল ফিতরের পর অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রচলন চালু হয়, যা আজও অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমানে মহারাজপুর মেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের অদূরে সোনামসজিদ রোডসংলগ্ন মহারাজপুর ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই মেলাটি স্থানীয় মিয়া-চৌধুরী পরিবারের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়। সময়ের সঙ্গে এটি একটি বৃহৎ লোকজ মেলায় রূপ নিয়েছে, যা জেলার অন্যতম সাংস্কৃতিক আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত।
মেলায় গ্রামীণ কুটিরশিল্পের বিভিন্ন পণ্য, মিষ্টি, খেলনা, বাঁশ ও বেতের তৈরি সামগ্রীসহ নানা পসরা বসে। কাঠের পুতুল, মাটির তৈজসপত্র ও কৃষিজ উপকরণ ক্রেতাদের বিশেষ আকর্ষণ করে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজন যাত্রা, জাদুপুতুল বা লোকনাট্য মেলার প্রাণবন্ত পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মেলা ঘুরে দেখা গেছে, এখানে গ্রামীণ জীবনের একটি জীবন্ত চিত্র ফুটে ওঠে। মেয়েদের সাজসজ্জার সামগ্রী, খই, বাতাসা, গুড়সহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান মেলাকে উৎসবমুখর করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির পেছনের খালি জায়গাতেও ছোট ছোট দোকান বসে, যা মেলার বিস্তৃতি ও জনপ্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়।
স্থানীয়দের মতে, এই দুই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন কেবল ধর্মীয় বা বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। যুগের পর যুগ ধরে এই মেলা ও পূজা এলাকার মানুষের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করেছে।
মহারাজপুর এলাকার কয়েকজন জানান ২০১৬ সলে মহারাজপুর মেলাটি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।  তবে সে সময় মেলায় ডিস্ক ড্যান্সসহ জুয়ার আসর বসলে জেলা প্রশাসন সেটা বন্দ করে দেয়। তার পর থেকে মহারাজপুরের ঐতিহ্যবাহী মেলাটি বন্দ হয়ে যায়।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এত দীর্ঘ ঐতিহ্য বহনকারী এই আয়োজনগুলোকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। তাদের দাবি, যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে মহারাজপুর মেলা ও ‘বাইশ পুতুল’ উৎসবকে জাতীয় পর্যায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে রূপ দেওয়া সম্ভব।
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

Categories

জুম্মার নামাজের পর বেলপুকুরে মাদকবিরোধী লিফলেট বিতরণ

দুই শতকের ঐতিহ্যে মহারাজপুর মেলা, তিন শতাব্দীর স্মৃতি বয়ে চলেছে ‘বাইশ পুতুল’ উৎসব

Update Time : ১০:০৭:৫১ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
চাঁপাইনবাবগঞ্জে শতাব্দীপ্রাচীন লোকজ সংস্কৃতির দুই গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন বারঘেরিয়ার ‘বাইশ পুতুল’ পূজা ও মহারাজপুর মেলা এলাকার সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য ধারাবাহিকতা তুলে ধরে। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ‘বাইশ পুতুল’ উৎসব যেমন তিন শতাব্দীর পুরোনো ইতিহাস বহন করছে, তেমনি ঈদুল ফিতরের পরদিন থেকে শুরু হওয়া মহারাজপুর মেলা প্রায় দুই শতকের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বারঘেরিয়া এলাকায় ব্রিটিশ আমল থেকে ‘বাইশ পুতুল’ মন্দিরকে ঘিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ বছর আগে গোমস্তাপুর উপজেলার শুক্রবাড়ি গ্রামে এই পূজার প্রচলন ছিল। কোনো এক সময় পূজার কাঠামো মহানন্দা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হলে তা ভেসে এসে বারঘেরিয়ায় পৌঁছায়। পরে স্বপ্নে নির্দেশ পেয়ে শুক্রবাড়ির বাসিন্দারা এখানে জমি কিনে পূজার আয়োজন শুরু করেন, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা বাসুদেব চন্দ্রপাল ও প্রভাস কুমার সাহা জানান, পূজাকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে এবং সেখান থেকেই মেলার সূচনা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় দেশ বিভাগের আগেই স্থানীয় মরহুম সদর আহমেদ মিয়া মহারাজপুর এলাকার একটি আমবাগানে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য পৃথকভাবে মেলার আয়োজন শুরু করেন। পরবর্তীতে এই মেলা ঈদুল ফিতরের পর অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রচলন চালু হয়, যা আজও অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমানে মহারাজপুর মেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের অদূরে সোনামসজিদ রোডসংলগ্ন মহারাজপুর ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই মেলাটি স্থানীয় মিয়া-চৌধুরী পরিবারের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়। সময়ের সঙ্গে এটি একটি বৃহৎ লোকজ মেলায় রূপ নিয়েছে, যা জেলার অন্যতম সাংস্কৃতিক আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত।
মেলায় গ্রামীণ কুটিরশিল্পের বিভিন্ন পণ্য, মিষ্টি, খেলনা, বাঁশ ও বেতের তৈরি সামগ্রীসহ নানা পসরা বসে। কাঠের পুতুল, মাটির তৈজসপত্র ও কৃষিজ উপকরণ ক্রেতাদের বিশেষ আকর্ষণ করে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজন যাত্রা, জাদুপুতুল বা লোকনাট্য মেলার প্রাণবন্ত পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মেলা ঘুরে দেখা গেছে, এখানে গ্রামীণ জীবনের একটি জীবন্ত চিত্র ফুটে ওঠে। মেয়েদের সাজসজ্জার সামগ্রী, খই, বাতাসা, গুড়সহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান মেলাকে উৎসবমুখর করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির পেছনের খালি জায়গাতেও ছোট ছোট দোকান বসে, যা মেলার বিস্তৃতি ও জনপ্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়।
স্থানীয়দের মতে, এই দুই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন কেবল ধর্মীয় বা বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। যুগের পর যুগ ধরে এই মেলা ও পূজা এলাকার মানুষের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করেছে।
মহারাজপুর এলাকার কয়েকজন জানান ২০১৬ সলে মহারাজপুর মেলাটি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।  তবে সে সময় মেলায় ডিস্ক ড্যান্সসহ জুয়ার আসর বসলে জেলা প্রশাসন সেটা বন্দ করে দেয়। তার পর থেকে মহারাজপুরের ঐতিহ্যবাহী মেলাটি বন্দ হয়ে যায়।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এত দীর্ঘ ঐতিহ্য বহনকারী এই আয়োজনগুলোকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। তাদের দাবি, যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে মহারাজপুর মেলা ও ‘বাইশ পুতুল’ উৎসবকে জাতীয় পর্যায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে রূপ দেওয়া সম্ভব।