
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আম, কাঁসা-পিতল, ধান, কলাই রুটি ও নকশিকাঁথার জন্য সুপরিচিত হলেও শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী “আদি চমচম” এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো এই মিষ্টিকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।
জেলাবাসীর মতে, দেশের অন্য কোথাও শিবগঞ্জের আদি চমচমের মতো স্বাদ ও গুণমানের চমচম তৈরি হয় না। এ কারণে এটিকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া সময়ের দাবি।
জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জের আদি চমচমের ইতিহাস বাংলার নবাবি আমলের। শিবগঞ্জের আদি চমচম এ জেলার দেড়শ বছরের ঐতিহ্যের ধারক। প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড় তথা অবিভক্ত ভারতের মালদহ জেলার থানা ছিল শিবগঞ্জ। সে সময় এ অঞ্চলে ছিল অনেক ময়রার বসবাস। দেশভাগের পর অনেকে মালদহে চলে গেলেও বেশকিছু পরিবার থেকে যায় শিবগঞ্জে। সেই সময় থেকে শুরু করে তারা এখনো পৈতৃক এ পেশা ধরে রেখেছেন। এই চমচমের নাম শুনলেই জিভে পানি চলে আসে। নানা আকারের সুস্বাদু চমচমের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চমৎকার ডিজাইন আর কড়া মিষ্টির আবরণের ভেতর গোলাপি আভাযুক্ত নরম অংশ।
ঐতিহ্যবাহী এ চমচম পাওয়া যায় কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ পৌর শহরের তিনটি দোকানে। অতুলনীয় স্বাদ, গন্ধ আর বর্ণের সংমিশ্রণে পোড়ানো ইটের মতো রঙ আদি চমচমের।
১৮৫৮ সালের দিকে শিবগঞ্জ বাজারে ‘আদি চমচমের’ আবির্ভাব ঘটান স্থানীয় নরেন্দ্র কুমার সরকার। তার মিষ্টির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সোনামসজিদ, কানসাট ছাড়িয়ে তৎকালীন মহকুমা শহর চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তার মৃত্যুর পর এ ব্যবসার হাল ধরেন তার দুই ছেলে তাবল সরকার এবং ইন্দ্রভূষণ সরকার।
বর্তমানে তিনপুরুষের আদি চমচমের ব্যবসায় চালাচ্ছেন ইন্দ্রভূষণ সরকার ছাড়াও তাবল সরকারের ছেলে অরুণ কুমার সরকার এবং অপর ভাই বিজয় কুমার সরকারের ছেলে রিপন কুমার সরকার।
শিবগঞ্জ বাজারে পাশাপাশি তিনটি আদি চমচমের দোকান। আদি চমচম, আসল আদি চমচম ও নিউ আদি চমচম। তিনটি দোকানকে কেন্দ্র করেই বিখ্যাত মিষ্টি শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে। গরুর খাঁটি দুধের ছানা ছাড়া আদি চমচম তৈরি অকল্পনীয়।
এছাড়া যে কেউ ইচ্ছা করলেই আদি চমচম তৈরি করতে পারে না। এ চমচম তৈরির সঙ্গে এ অঞ্চলের আবহাওয়া ও পানির বিশেষ বৈশিষ্ট্য জড়িত রয়েছে। এর আগে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মিষ্টি তৈরির কারিগররা এই আদি চমচম তৈরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। সুস্বাদু আদি চমচম তৈরির জন্য একমাত্র শিবগঞ্জের পানি ও আবহাওয়াই উপযোগী।
আদি চমচমের মূল বিশেষত্ব হচ্ছে কড়া পাকে বিশেষ কায়দায় ছানা, মেওয়া ও চিনির সমন্বয়ে তৈরি মিষ্টি। অস্থিরচিত্তে বা আনমনে থাকলে কখনোই আদি চমচম তৈরি করা সম্ভয় নয়। মাপমতো চুলার আগুনের তাপ দিয়ে আদি চমচমের বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে হয়। চিনি সিরা (রস) তৈরিতেও বিশেষভাবে নজর রাখতে হয়।
আগুনের তাপের তারতম্য হলে স্বাদ-গন্ধ-বর্ণে আদি চমচমের স্বকীয়তা নষ্ট হয়ে যায়। এ অঞ্চলের আদি চমচম তৈরির প্রসিদ্ধ কারিগর ছিলেন ভাদু সাহা। তার হাতের তৈরি মিষ্টি ছিল অতুলনীয়। তিনি প্রায় আধামণ ওজনের আদি চমচমও তৈরি করতে পারতেন। স্বাধীনতা-উত্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীতে তার তৈরি বিশাল এ আদি চমচম প্রদর্শিত হয়।
শিবগঞ্জে আদি চমচম প্রতিকেজির দাম ৩০০ টাকা। প্রতিটির ওজন ৭৫ গ্রাম থেকে ১৫০ গ্রাম। তবে ৫ থেকে ৮ কেজি ওজনের আদি চমচমও তারা সরবরাহ করেন ৬০০ টাকা কেজি দামে।
বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে অনেক মানুষ বড় আকৃতির এ আদি চমচম অর্ডার দিলে তারা সরবরাহ করে থাকেন। শিবগঞ্জ উপজেলা শহরের তিনটি দোকান থেকে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ মণ আদি চমচম বিক্রি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আদি চমচম নিতে এই দোকানগুলোতেই মানুষ ভিড় করে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রবীণ আইনজীবী মরহুম তাসেম মিয়া উকিল এক আড্ডায় স্মৃতিচারণ করে এই প্রতিবেদকে জানান, ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক সফরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এলে তাসেম বোর্ডিংয়ে রাত্রিযাপন করেন। সে সময় রাতের খাবারের পর তিনি বঙ্গবন্ধুকে শিবগঞ্জের বিখ্যাত আদি চমচম পরিবেশন করেন।
তাসেম মিয়া উকিলের ভাষ্য অনুযায়ী, আদি চমচমের স্বাদ গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত প্রশংসা করেন এবং এর স্বকীয়তা ও অনন্যতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ওই সময় থেকেই শিবগঞ্জের আদি চমচমের খ্যাতি আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি স্থানীয় ঐতিহ্যের গর্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃতি সন্তান ও ঢাকাস্থ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সমিতির সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মাহাতাব উদ্দিন বলেন, শিবগঞ্জের আদি চমচমকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। তাঁর মতে, এই চমচমের মান, স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য এতটাই অনন্য যে বাংলাদেশের অন্য কোথাও একই মানের চমচম তৈরি করা সম্ভব হয়নি, যদিও অনেকেই এর অনুকরণে চেষ্টা করেছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশিদ বলেন, দেড়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিবগঞ্জ তার আদি চমচমের স্বকীয়তা অটুট রেখেছে। একসময় যেমন দূর-দূরান্ত থেকে আগত মানুষ শিবগঞ্জে এসে চমচম কিনে বাক্সভর্তি করে নিয়ে যেতেন, আজও সেই চিত্রের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। এখনও এই মিষ্টির আকর্ষণেই অনেকেই শিবগঞ্জে ছুটে আসেন এবং প্রিয়জনদের জন্য চমচম সঙ্গে করে নিয়ে যান। তিনি আরও বলেন, কড়া পাকে বিশেষ কৌশলে ছানা, মেওয়া ও চিনির নিখুঁত সংমিশ্রণে তৈরি এই চমচম একবার স্বাদ নিলে তার অনন্যতা সহজে ভোলার নয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, আদি চমচম এমন একটি ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি যা ইচ্ছা করলেই তৈরি করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতা, অভিজ্ঞতা। তিনি শিবগঞ্জে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো আদি চমচমের স্বাদ গ্রহণ করে এর স্বকীয়তা ও মানে মুগ্ধ হন।
তিনি আরও জানান, শিবগঞ্জের এই ঐতিহ্যবাহী আদি চমচমকে জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে তিনি জেলার সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করবেন।
আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ড. মাজহারুল ইসলাম তরু বলেন, শিবগঞ্জের প্রায় ১৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী আদি চমচম শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি এ অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর স্বাদ, গন্ধ ও মান এতটাই অনন্য যে বাংলাদেশের অন্য কোথাও এর সমতুল্য চমচম পাওয়া যায় না বলে তিনি মনে করেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যবাহী প্রস্তুত প্রণালীর কারণে এই মিষ্টি বিশেষ স্বাতন্ত্র্য অর্জন করেছে। তাই তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিবগঞ্জের আদি চমচমকে জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে এটি দেশ-বিদেশে আরও পরিচিতি পাবে এবং স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোঃ মুসা জঙ্গী বলেন, শিবগঞ্জের আদি চমচম শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক। প্রায় দেড়শ’ বছরের এই ঐতিহ্যবাহী পণ্যটি জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতি পাওয়ার সব ধরনের যোগ্যতা রাখে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, শিবগঞ্জ উপজেলার (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার) পক্ষ থেকে প্রস্তাবনা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, যথাযথ ডকুমেন্টেশন প্রস্তুত এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর বিষয়ে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
Reporter Name 















