বিশ্বজুড়ে চোখ এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে

  • Md Biplob Ahommed
  • Update Time : ০৯:৪৬:৫৫ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
  • ১৯ Time View

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত আয়োজন ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর পর্দা উঠছে আজ। চার বছর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে এমন এক বিশ্বকাপ, যা আকার, পরিধি, অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা এবং ম্যাচ আয়োজনের দিক থেকে অতীতের সব আসরকে ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং ফুটবলের ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ যৌথভাবে এই আসরের আয়োজন করছে। ৩২ দলের পরিবর্তে ৪৮ দল এবং ৬৪ ম্যাচের পরিবর্তে ১০৪ ম্যাচ নিয়ে এবারের বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে দীর্ঘ এবং সবচেয়ে বিস্তৃত আয়োজন। ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত টানা ৩৯ দিন ধরে চলবে এই মহাযজ্ঞ।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মেক্সিকো সিটির কিংবদন্তি এস্তাদিও আজটেকা স্টেডিয়ামে। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় সহ-আয়োজক মেক্সিকো মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকার। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ভেন্যু আজটেকা স্টেডিয়াম এর আগেও দুটি বিশ্বকাপের সাক্ষী হয়েছে। এখানেই পেলের ব্রাজিল ১৯৭০ সালে এবং দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করেছিল। এবার তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে আজটেকা স্টেডিয়াম গড়তে যাচ্ছে অনন্য এক রেকর্ড।

মেক্সিকোর জন্যও এটি একটি বিশেষ উপলক্ষ। ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের পর দেশটি তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর আগে কোনো দেশ তিনবার এই টুর্নামেন্ট আয়োজনের সুযোগ পায়নি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি, লস অ্যাঞ্জেলেস, মিয়ামি, ডালাস, আটালান্টা, হিউস্টন, ফিলাডেলফিয়া, সিয়াটলসহ একাধিক শহর বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করবে। কানাডার টরন্টো ও ভ্যানকুভার এবং মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা ও মন্টেরেও থাকছে আয়োজক শহরের তালিকায়।

প্রায় ছয় সপ্তাহব্যাপী এই আসরের সমাপ্তি ঘটবে ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। প্রায় ৮২ হাজার ৫০০ দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের ফাইনাল, যেখানে নির্ধারিত হবে ফুটবল বিশ্বের নতুন রাজা।

তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই বিশ্বকাপকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও আলোচনা সামনে এসেছে। টিকিটের মূল্য নিয়ে সমালোচনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে যেখানে সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ ডলার, সেখানে এবারের কিছু প্রিমিয়াম টিকিটের মূল্য প্রায় ৩২ হাজার ৯৭০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। এতে সাধারণ সমর্থকদের বড় একটি অংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মন্তব্য করেছেন, এত বেশি দামে তিনি নিজেও টিকিট কিনতেন না।

রাজনৈতিক বাস্তবতাও বিশ্বকাপকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে কিছু ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। ইরানের বেস ক্যাম্প অ্যারিজোনা থেকে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় স্থানান্তর করা হয়েছে। এছাড়া ভিসা জটিলতার কারণে দেশটির কয়েকজন কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তেহরান এই ঘটনাকে বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

তবে মাঠের ফুটবলই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণ। এবারের আসরের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ফুটবল ইতিহাসের দুই মহাতারকার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে এটি। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো মেসির বয়স এখন ৩৮। তিনি কি দলকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ উপহার দিতে পারবেন, সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের মনে। অন্যদিকে ৪১ বছর বয়সী রোনালদো যদি পর্তুগালকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিতে পারেন, তবে সেটি হবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রূপকথার গল্প।

শুধু মেসি-রোনালদো নন, আলোচনায় রয়েছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনও। ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে ইংল্যান্ড। এছাড়া কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স, তরুণ প্রতিভায় ভরপুর স্পেন, জার্মানি এবং বিশ্বকাপের চিরচেনা শক্তি ব্রাজিলও শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার পাশাপাশি ফ্রান্স, স্পেন ও ইংল্যান্ডকে অনেক বিশ্লেষক শিরোপার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন।

বিশ্বকাপ ২০২৬ হতে যাচ্ছে প্রজন্ম বদলেরও একটি বড় মঞ্চ। মেসি ও রোনালদোর যুগ শেষের পথে, আর সেই জায়গা দখল করতে প্রস্তুত নতুন প্রজন্ম। কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুড বেলিংহ্যাম, লামিন ইয়ামাল, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এরলিং হালান্ড, জামাল মুসিয়ালা ও ফিল ফোডেনদের দিকে থাকবে বিশেষ নজর। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চেই সাধারণত জন্ম নেয় নতুন কিংবদন্তি, তাই তরুণদের পারফরম্যান্সও এবারের আসরের অন্যতম আকর্ষণ।

এবারের বিশ্বকাপের ফরম্যাটেও এসেছে বড় পরিবর্তন। ৪৮টি দলকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে। প্রতিটি গ্রুপে থাকবে চারটি করে দল। গ্রুপপর্বে প্রতিটি দল খেলবে তিনটি করে ম্যাচ। এরপর প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি নকআউট পর্বে উঠবে। পাশাপাশি সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দলও জায়গা পাবে পরের রাউন্ডে। ফলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে ৩২ দলের নকআউট পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। গ্রুপপর্বে হবে ৭২টি ম্যাচ, আর পুরো টুর্নামেন্টে ম্যাচ সংখ্যা দাঁড়াবে ১০৪-এ।

বিশ্বকাপকে আরও আধুনিক ও দর্শকবান্ধব করতে কয়েকটি নতুন নিয়মও যুক্ত করেছে ফিফা। খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য কুলিং ব্রেক, দ্রুত বদলি প্রক্রিয়া এবং বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া ফাইনালে সুপার বোল ধাঁচের হাফটাইম শো আয়োজনের পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। এতে ম্যাডোনা, শাকিরা এবং বিটিএসের মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের পারফর্ম করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর ফলে ফাইনালের হাফটাইম বিরতির সময়ও প্রচলিত ১৫ মিনিটের পরিবর্তে প্রায় ২৫ মিনিটে উন্নীত হতে পারে।

শুধু ক্রীড়া নয়, অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বিশাল প্রভাব ফেলবে এই বিশ্বকাপ। বিশ্লেষকদের ধারণা, টেলিভিশন সম্প্রচার, স্পন্সরশিপ, বিজ্ঞাপন, টিকিট বিক্রি ও পর্যটন খাত থেকে ফিফার আয় ১৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। আয়োজক তিন দেশের বিভিন্ন শহরে লাখো পর্যটকের আগমন স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতি সঞ্চার করবে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও খুচরা ব্যবসায়ও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, সংস্কৃতি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বৈশ্বিক মিলনমেলা। আফ্রিকার গ্রাম থেকে ইউরোপের নগরী, লাতিন আমেরিকার সমুদ্রতীর থেকে এশিয়ার জনপদ-পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি কোণেই বিশ্বকাপ ঘিরে তৈরি হয় এক অনন্য উন্মাদনা। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী ইতোমধ্যেই প্রিয় দলের পতাকা টাঙিয়েছেন, শুরু হয়েছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন ও পর্তুগালের সমর্থকদের তর্ক-বিতর্ক, বিশ্লেষণ এবং স্বপ্ন দেখা।

আজ মেক্সিকো সিটির আকাশে উদ্বোধনের আলো জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অধ্যায়গুলোর একটি। আগামী ৩৯ দিনের এই মহারণ শেষে ১৯ জুলাই বিশ্ব পাবে নতুন এক চ্যাম্পিয়ন। তবে তার আগে কোটি কোটি মানুষের আবেগ, প্রত্যাশা এবং উন্মাদনায় মুখর থাকবে পুরো ফুটবল বিশ্ব!

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

Categories

বিশ্বজুড়ে চোখ এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে

Update Time : ০৯:৪৬:৫৫ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত আয়োজন ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর পর্দা উঠছে আজ। চার বছর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে এমন এক বিশ্বকাপ, যা আকার, পরিধি, অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা এবং ম্যাচ আয়োজনের দিক থেকে অতীতের সব আসরকে ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং ফুটবলের ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ যৌথভাবে এই আসরের আয়োজন করছে। ৩২ দলের পরিবর্তে ৪৮ দল এবং ৬৪ ম্যাচের পরিবর্তে ১০৪ ম্যাচ নিয়ে এবারের বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে দীর্ঘ এবং সবচেয়ে বিস্তৃত আয়োজন। ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত টানা ৩৯ দিন ধরে চলবে এই মহাযজ্ঞ।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মেক্সিকো সিটির কিংবদন্তি এস্তাদিও আজটেকা স্টেডিয়ামে। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় সহ-আয়োজক মেক্সিকো মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকার। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ভেন্যু আজটেকা স্টেডিয়াম এর আগেও দুটি বিশ্বকাপের সাক্ষী হয়েছে। এখানেই পেলের ব্রাজিল ১৯৭০ সালে এবং দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করেছিল। এবার তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে আজটেকা স্টেডিয়াম গড়তে যাচ্ছে অনন্য এক রেকর্ড।

মেক্সিকোর জন্যও এটি একটি বিশেষ উপলক্ষ। ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের পর দেশটি তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর আগে কোনো দেশ তিনবার এই টুর্নামেন্ট আয়োজনের সুযোগ পায়নি। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি, লস অ্যাঞ্জেলেস, মিয়ামি, ডালাস, আটালান্টা, হিউস্টন, ফিলাডেলফিয়া, সিয়াটলসহ একাধিক শহর বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করবে। কানাডার টরন্টো ও ভ্যানকুভার এবং মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা ও মন্টেরেও থাকছে আয়োজক শহরের তালিকায়।

প্রায় ছয় সপ্তাহব্যাপী এই আসরের সমাপ্তি ঘটবে ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। প্রায় ৮২ হাজার ৫০০ দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের ফাইনাল, যেখানে নির্ধারিত হবে ফুটবল বিশ্বের নতুন রাজা।

তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই বিশ্বকাপকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও আলোচনা সামনে এসেছে। টিকিটের মূল্য নিয়ে সমালোচনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে যেখানে সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ ডলার, সেখানে এবারের কিছু প্রিমিয়াম টিকিটের মূল্য প্রায় ৩২ হাজার ৯৭০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। এতে সাধারণ সমর্থকদের বড় একটি অংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মন্তব্য করেছেন, এত বেশি দামে তিনি নিজেও টিকিট কিনতেন না।

রাজনৈতিক বাস্তবতাও বিশ্বকাপকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে কিছু ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। ইরানের বেস ক্যাম্প অ্যারিজোনা থেকে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় স্থানান্তর করা হয়েছে। এছাড়া ভিসা জটিলতার কারণে দেশটির কয়েকজন কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তেহরান এই ঘটনাকে বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

তবে মাঠের ফুটবলই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণ। এবারের আসরের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ফুটবল ইতিহাসের দুই মহাতারকার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে এটি। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো মেসির বয়স এখন ৩৮। তিনি কি দলকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ উপহার দিতে পারবেন, সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের মনে। অন্যদিকে ৪১ বছর বয়সী রোনালদো যদি পর্তুগালকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিতে পারেন, তবে সেটি হবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রূপকথার গল্প।

শুধু মেসি-রোনালদো নন, আলোচনায় রয়েছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনও। ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে ইংল্যান্ড। এছাড়া কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স, তরুণ প্রতিভায় ভরপুর স্পেন, জার্মানি এবং বিশ্বকাপের চিরচেনা শক্তি ব্রাজিলও শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার পাশাপাশি ফ্রান্স, স্পেন ও ইংল্যান্ডকে অনেক বিশ্লেষক শিরোপার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন।

বিশ্বকাপ ২০২৬ হতে যাচ্ছে প্রজন্ম বদলেরও একটি বড় মঞ্চ। মেসি ও রোনালদোর যুগ শেষের পথে, আর সেই জায়গা দখল করতে প্রস্তুত নতুন প্রজন্ম। কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুড বেলিংহ্যাম, লামিন ইয়ামাল, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এরলিং হালান্ড, জামাল মুসিয়ালা ও ফিল ফোডেনদের দিকে থাকবে বিশেষ নজর। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চেই সাধারণত জন্ম নেয় নতুন কিংবদন্তি, তাই তরুণদের পারফরম্যান্সও এবারের আসরের অন্যতম আকর্ষণ।

এবারের বিশ্বকাপের ফরম্যাটেও এসেছে বড় পরিবর্তন। ৪৮টি দলকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে। প্রতিটি গ্রুপে থাকবে চারটি করে দল। গ্রুপপর্বে প্রতিটি দল খেলবে তিনটি করে ম্যাচ। এরপর প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি নকআউট পর্বে উঠবে। পাশাপাশি সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দলও জায়গা পাবে পরের রাউন্ডে। ফলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে ৩২ দলের নকআউট পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। গ্রুপপর্বে হবে ৭২টি ম্যাচ, আর পুরো টুর্নামেন্টে ম্যাচ সংখ্যা দাঁড়াবে ১০৪-এ।

বিশ্বকাপকে আরও আধুনিক ও দর্শকবান্ধব করতে কয়েকটি নতুন নিয়মও যুক্ত করেছে ফিফা। খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য কুলিং ব্রেক, দ্রুত বদলি প্রক্রিয়া এবং বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া ফাইনালে সুপার বোল ধাঁচের হাফটাইম শো আয়োজনের পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। এতে ম্যাডোনা, শাকিরা এবং বিটিএসের মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের পারফর্ম করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর ফলে ফাইনালের হাফটাইম বিরতির সময়ও প্রচলিত ১৫ মিনিটের পরিবর্তে প্রায় ২৫ মিনিটে উন্নীত হতে পারে।

শুধু ক্রীড়া নয়, অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বিশাল প্রভাব ফেলবে এই বিশ্বকাপ। বিশ্লেষকদের ধারণা, টেলিভিশন সম্প্রচার, স্পন্সরশিপ, বিজ্ঞাপন, টিকিট বিক্রি ও পর্যটন খাত থেকে ফিফার আয় ১৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। আয়োজক তিন দেশের বিভিন্ন শহরে লাখো পর্যটকের আগমন স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতি সঞ্চার করবে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও খুচরা ব্যবসায়ও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, সংস্কৃতি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বৈশ্বিক মিলনমেলা। আফ্রিকার গ্রাম থেকে ইউরোপের নগরী, লাতিন আমেরিকার সমুদ্রতীর থেকে এশিয়ার জনপদ-পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি কোণেই বিশ্বকাপ ঘিরে তৈরি হয় এক অনন্য উন্মাদনা। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী ইতোমধ্যেই প্রিয় দলের পতাকা টাঙিয়েছেন, শুরু হয়েছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন ও পর্তুগালের সমর্থকদের তর্ক-বিতর্ক, বিশ্লেষণ এবং স্বপ্ন দেখা।

আজ মেক্সিকো সিটির আকাশে উদ্বোধনের আলো জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অধ্যায়গুলোর একটি। আগামী ৩৯ দিনের এই মহারণ শেষে ১৯ জুলাই বিশ্ব পাবে নতুন এক চ্যাম্পিয়ন। তবে তার আগে কোটি কোটি মানুষের আবেগ, প্রত্যাশা এবং উন্মাদনায় মুখর থাকবে পুরো ফুটবল বিশ্ব!