শিরোনামঃ

রাজশাহীর ৫ ফেরিঘাট মাদক পাচারের নিরাপদ রুট

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:৫৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
  • ৩০ Time View

রাজশাহীর ৫ ফেরিঘাট মাদক পাচারের নিরাপদ রুট

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মা নদীর পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ফেরিঘাট বেদখল হয়ে গেছে। দুই বছর ধরে ইজারা দিতে পারছে না জেলা পরিষদ। প্রভাবশালীরা যে যার মতো করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে দুই বছরে পাঁচটি ফেরিঘাট থেকে সরকার প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে। এলাকাবাসী জানায়, ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া ছয়টি খেয়াঘাট হলো-প্রেমতলী, বিদিরপুর, ফুলতলা, রেলবাজার, হাটপাড়া, ভগবন্তপুর ও সুলতানগঞ্জ। তবে চলতি বছর শুধু সুলতানগঞ্জ ফেরিঘাট ইজারা দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ফেরিঘাটগুলো দখলে আন্দোলনরত বিভিন্ন পক্ষ। ইজারাদারদের বিতাড়িত করে তারা নিজেরাই টোল আদায় শুরু করেন। সেই ধারা অব্যাহত থাকলেও তারা ফেরিঘাটগুলো বিলুপ্তির দাবিতে নতুন আন্দোলন শুরু করেছেন।

জানা গেছে, ২০২৪ সালে ছয়টি ফেরিঘাটই ইজারা হয়েছিল। ইজারা থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল প্রায় পৌনে ৪ কোটি টাকা। এরপর দুই বছর আর ইজারা দিতে পারেনি রাজশাহী জেলা পরিষদ। ২০২৪ সালের আগস্টের পর এলাকাবাসীর ব্যানারে ইজারা ব্যবস্থা বিলুপ্তির আন্দোলন শুরু হলে তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার আজিম উদ্দিন খন্দকার ইজারা নিলাম বন্ধের নির্দেশ দেন। চলতি বছরও ইজারা প্রক্রিয়া শুরু করে শেষ না হতে উচ্চ আদালতে রিট করে বন্ধ রাখা হয়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ-সীমান্তবর্তী ঘাটগুলো মাদক পাচারের নিরাপদ ও জনপ্রিয় রুট। ঘাটগুলো ইজারা হওয়ায় মাদক চোরাচালান কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু দুই বছর ঘাটগুলোর ইজারাদার না থাকায় মাদক পাচারের মুক্ত গেটওয়ে হয়ে উঠেছে। যে যেমনভাবে পারছে নদী পাড়ি দিচ্ছে। রাতদিনের কোনো ফারাক নেই। দূর্গম এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও মাদক পাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

জানতে চাইলে জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী ইশা বলেন, দুই বছর গোদাগাড়ীর পাঁচটি ফেরিঘাট থেকে এক টাকাও পাওয়া যায়নি। ঘাটগুলো ইজারা দিতে বারবার চেষ্টা করেও পারা যায়নি। এখন একটি রাজনৈতিক দলের লোকেরা উচ্চ আদালতে রিট করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন-কখনো বৈষম্যবিরোধী কখনো জুলাই যোদ্ধা আবার কখনো এলাকাবাসী ছাত্র-কর্মজীবী জোট ব্যানারে আন্দোলন করে খেয়াঘাট পাঁচটির ইজারা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করেছে। এখনও তারা তৎপরতা চালাচ্ছে। এর পেছনে এলাকাবাসীর সুবিধার চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলই প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। বিভাগীয় কমিশনার পাঁচটি ফেরিঘাটের ইজারা বিলুপ্তির সুপারিশ পাঠায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তা নাকচ করে নির্দেশে।

এদিকে, কয়েক কোটি টাকায় ইজারা নিয়েও ইজারাদাররা ঘাট পরিচালনা করতে পারেননি। তারা পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। জেলা পরিষদও তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়নি।

এলাকা সরেজমিনে দেখা গেছে, গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ ও পাশের আলাতুলি ইউনিয়ন দুটি মূল ভূখণ্ড থেকে পদ্মা নদীর কারণে বিচ্ছিন্ন। পদ্মার চরের গ্রামগুলো জনবহুল। ইজারাদার না থাকায় এলাকাবাসীর যাতায়াতে চরম ভোগান্তি হচ্ছে প্রতিদিন। বিশেষ মহলটি নিজেদের নৌকায় করে যাত্রী পারাপার করছে। তারাই যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছে। চলতি বছরে আদায় করা এক টাকাও জেলা পরিষদে জমা দেওয়া হয়নি।

জানা গেছে, বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে উর্বর কৃষি যেমন আছে তেমনি এলাকাগুলো মাদক চোরাচালানের অন্যতম প্রধান রুটও। পর্যাপ্ত নৌকা বা জলযান না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চরাঞ্চলে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারে না। মাদক কারবারীরা নৌকায় রাতের আঁধারে অবাধে মাদক চোরাচালান করে।

জেলা পরিষদ প্রশাসক অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী ইশা বলেন, জনসাধারণের যাতায়াতের সুবিধার্থেই ফেরিঘাট। ফেরিঘাটগুলো সরকারি সম্পদ। সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত। ঘাট বিলুপ্ত করার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি আইনের মাধ্যমে সমাধান করা হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

Categories

রাজশাহীর ৫ ফেরিঘাট মাদক পাচারের নিরাপদ রুট

Update Time : ১১:৫৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মা নদীর পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ফেরিঘাট বেদখল হয়ে গেছে। দুই বছর ধরে ইজারা দিতে পারছে না জেলা পরিষদ। প্রভাবশালীরা যে যার মতো করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে দুই বছরে পাঁচটি ফেরিঘাট থেকে সরকার প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে। এলাকাবাসী জানায়, ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া ছয়টি খেয়াঘাট হলো-প্রেমতলী, বিদিরপুর, ফুলতলা, রেলবাজার, হাটপাড়া, ভগবন্তপুর ও সুলতানগঞ্জ। তবে চলতি বছর শুধু সুলতানগঞ্জ ফেরিঘাট ইজারা দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ফেরিঘাটগুলো দখলে আন্দোলনরত বিভিন্ন পক্ষ। ইজারাদারদের বিতাড়িত করে তারা নিজেরাই টোল আদায় শুরু করেন। সেই ধারা অব্যাহত থাকলেও তারা ফেরিঘাটগুলো বিলুপ্তির দাবিতে নতুন আন্দোলন শুরু করেছেন।

জানা গেছে, ২০২৪ সালে ছয়টি ফেরিঘাটই ইজারা হয়েছিল। ইজারা থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল প্রায় পৌনে ৪ কোটি টাকা। এরপর দুই বছর আর ইজারা দিতে পারেনি রাজশাহী জেলা পরিষদ। ২০২৪ সালের আগস্টের পর এলাকাবাসীর ব্যানারে ইজারা ব্যবস্থা বিলুপ্তির আন্দোলন শুরু হলে তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার আজিম উদ্দিন খন্দকার ইজারা নিলাম বন্ধের নির্দেশ দেন। চলতি বছরও ইজারা প্রক্রিয়া শুরু করে শেষ না হতে উচ্চ আদালতে রিট করে বন্ধ রাখা হয়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ-সীমান্তবর্তী ঘাটগুলো মাদক পাচারের নিরাপদ ও জনপ্রিয় রুট। ঘাটগুলো ইজারা হওয়ায় মাদক চোরাচালান কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু দুই বছর ঘাটগুলোর ইজারাদার না থাকায় মাদক পাচারের মুক্ত গেটওয়ে হয়ে উঠেছে। যে যেমনভাবে পারছে নদী পাড়ি দিচ্ছে। রাতদিনের কোনো ফারাক নেই। দূর্গম এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও মাদক পাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

জানতে চাইলে জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী ইশা বলেন, দুই বছর গোদাগাড়ীর পাঁচটি ফেরিঘাট থেকে এক টাকাও পাওয়া যায়নি। ঘাটগুলো ইজারা দিতে বারবার চেষ্টা করেও পারা যায়নি। এখন একটি রাজনৈতিক দলের লোকেরা উচ্চ আদালতে রিট করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন-কখনো বৈষম্যবিরোধী কখনো জুলাই যোদ্ধা আবার কখনো এলাকাবাসী ছাত্র-কর্মজীবী জোট ব্যানারে আন্দোলন করে খেয়াঘাট পাঁচটির ইজারা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করেছে। এখনও তারা তৎপরতা চালাচ্ছে। এর পেছনে এলাকাবাসীর সুবিধার চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলই প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। বিভাগীয় কমিশনার পাঁচটি ফেরিঘাটের ইজারা বিলুপ্তির সুপারিশ পাঠায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তা নাকচ করে নির্দেশে।

এদিকে, কয়েক কোটি টাকায় ইজারা নিয়েও ইজারাদাররা ঘাট পরিচালনা করতে পারেননি। তারা পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। জেলা পরিষদও তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়নি।

এলাকা সরেজমিনে দেখা গেছে, গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ ও পাশের আলাতুলি ইউনিয়ন দুটি মূল ভূখণ্ড থেকে পদ্মা নদীর কারণে বিচ্ছিন্ন। পদ্মার চরের গ্রামগুলো জনবহুল। ইজারাদার না থাকায় এলাকাবাসীর যাতায়াতে চরম ভোগান্তি হচ্ছে প্রতিদিন। বিশেষ মহলটি নিজেদের নৌকায় করে যাত্রী পারাপার করছে। তারাই যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছে। চলতি বছরে আদায় করা এক টাকাও জেলা পরিষদে জমা দেওয়া হয়নি।

জানা গেছে, বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে উর্বর কৃষি যেমন আছে তেমনি এলাকাগুলো মাদক চোরাচালানের অন্যতম প্রধান রুটও। পর্যাপ্ত নৌকা বা জলযান না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চরাঞ্চলে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারে না। মাদক কারবারীরা নৌকায় রাতের আঁধারে অবাধে মাদক চোরাচালান করে।

জেলা পরিষদ প্রশাসক অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী ইশা বলেন, জনসাধারণের যাতায়াতের সুবিধার্থেই ফেরিঘাট। ফেরিঘাটগুলো সরকারি সম্পদ। সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত। ঘাট বিলুপ্ত করার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি আইনের মাধ্যমে সমাধান করা হবে।