
বিদ্যুতের বিদ্যমান পাইকারি দরে লোকসান দিচ্ছে বলে দাবি করেছে বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলো। লোকসান ঠেকাতে ডেসকো ৯.৬৭ শতাংশ, ডিপিডিসি ৬.৯৬ শতাংশ ওজোপাডিকো ১০ শতাংশ, আরইবি ৫.৯৩ শতাংশ অন্যদিকে নেসকো ইউনিট প্রতি ৩ পয়সা এবং বিপিডিবি ২৯ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে।
পাশাপাশি পাইকারি দাম বেড়ে গেলে সমহারে বাড়ানোর আবেদন করেছে কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে বিপিডিবি পাইকারি দর ইউনিট প্রতি ১.২০ টাকা (১৭ শতাংশ) থেকে ১.৫০ টাকা (২১ শতাংশ) বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে।
কোম্পানিগুলো সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পৃথকভাবে দাম বাড়ানোর আবেদন জমা দিয়েছে। দাম বৃদ্ধির আবেদনের উপর আগামী ২০ ও ২১ মে গণশুনানি গ্রহণ করবে বিইআরসি।
ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো) তার প্রস্তাবে বলেছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত পাইকারি দাম ৩৬.৯৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ওই সময়ে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে মাত্র ২৫.০২ শতাংশ। এতে করে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৬২ কোটি, পরবর্তী দুই অর্থবছরে যথাক্রমে ৯৫২ এবং ৫৯৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। লোকসান ঠেকাতে হলে ৯.৬৭ শতাংশ হারে দাম বাড়ানো জরুরি। এর পাশাপাশি নতুন করে পাইকারি দাম বাড়লে সেই পরিমাণ যোগ করার আবেদন করেছে ঢাকা সিটির উত্তরাংশে বিতরণের দায়িত্বে থাকা কোম্পানিটি।
অন্যদিকে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) তার প্রস্তাবে বলেছে পাইকারি দাম যে হারে বেড়েছে খুচরা সে হারে বাড়েনি। তাই ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬৪৩ কোটি টাকা, পরের বছর ৩০২ কোটি, এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। লোকসান সামাল দিতে হলে ৬.৯৬ শতাংশ হারে দাম বাড়ানো প্রয়োজন। নতুন করে পাইকারি দাম বাড়লে সেই পরিমাণও যোগ করার আবেদন জমা দিয়েছে বিইআরসিতে।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) তার প্রস্তাবে বলেছে, ৮০ টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নীট লোকসান দিয়েছে ১৬৯৮ কোটি টাকা। গ্রাহক পর্যায়ে দাম না বাড়লে চলতি অর্থবছরে ২ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা লোকসান হবে। লোকসান ঠেকাতে হলে ৫.৯৩ শতাংশ হারে দাম বাড়ানো প্রয়োজন। পাইকারি দাম বাড়লে ৫.৯৩ শতাংশের সঙ্গে সেই পরিমাণও যোগ করার আবেদন করেছে আরইবি।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) তার প্রস্তাবে বলেছে পাইকারি দামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খুচরা দাম বৃদ্ধি না হওয়ায় বিপিডিবির বিতরণ অঞ্চলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। লোকসান বন্ধ করতে হলে প্রতি ইউনিটে ২৯ পয়সা হারে দাম বাড়ানো দরকার। এছাড়া পাইকারি দাম নতুন করে বৃদ্ধি পেলে সেই পরিমাণও যোগ করার আবেদন করেছে।
ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি তার প্রস্তাবে বলেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩১ কোটি লোকসান হয়েছে। লোকসান ঠেকাতে হলে ১০ শতাংশ হারে দাম বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে কম ঘাটতি দেখিয়েছে নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো)। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের শহরাঞ্চলে বিতরণের দায়িত্বে থাকা কোম্পানিটি ইউনিট প্রতি ৩ পয়সা ঘাটতিতে রয়েছে। পাইকারি দাম নতুন করে ২০ শতাংশ বাড়লে, খুচরা দাম ২২ শতাংশ বাড়ানোর আবেদন করেছে।
পিছিয়ে নেই পিজিসিবিও (পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি), সঞ্চালন কোম্পানিটি প্রতি ইউনিটে যথাক্রমে ৩০ ও ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ ও ৪৯ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে। সঞ্চালন চার্জ বেড়ে গেলে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর সঙ্গে সেই পরিমাণ বাড়তি যোগ করার আবেদন করেছে বিতরণ কোম্পানিগুলো।
সবমিলিয়ে নজিরবিহীন দাম বৃদ্ধির মুখোমুখি রয়েছে ভোক্তারা। বিলিং মাস জুন থেকেই দাম বাড়ানোর চাপ অব্যাহত রেখেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সেই চাপে ব্যাপক তৎপর বিইআরসি, ঝড়ো গতিতে চলছে দাম বাড়ানোর কার্যক্রম।
পাইকারি দাম বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতি ৬ মাস পর পর দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে গণশুনানি ছাড়াই দাম বাড়ানোর ফর্মূলা চায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
বিপিডিবির পাইকারি দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন খরচ পড়বে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ১২.৯১ টাকার মতো। বিদ্যমান পাইকারি দামে বিক্রিতে আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। এতে করে ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ইউনিট প্রতি ১.২০ টাকা (১৭ শতাংশ) বৃদ্ধি হলে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৩২৯ কোটি আর ১.৫০ টাকা (২১ শতাংশ) হারে দাম বাড়লে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
আইন অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এখতিয়ার বিইআরসির হাতে। নিয়ম অুনযায়ী প্রস্তাব পাওয়ার পর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব এবং টেকনিক্যাল কমিটির রিপোর্ট গণশুনানিতে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে সকল পক্ষের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত দেন বিইআরসি।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। ওই আদেশে পাইকারি বিদ্যুতের গড় দর ৬.৭০ টাকা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭.০৪ টাকা করা হয়। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ৮.৫০ শতাংশ হারে দাম বৃদ্ধি করা হয়। তার আগে ৩০ জানুয়ারি এবং ১২ জানুয়ারি বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ করে বিদ্যুৎ বিভাগ।
আর বিইআরসি সর্বশেষ ২০২২ সালের ২১ নভেম্বর পাইকারিতে ইউনিট প্রতি ১৯.৯২ শতাংশ বাড়িয়ে ৬.২০ টাকা নির্ধারণ করে। তারপর বিতরণ কোম্পানিগুলোর আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি গণশুনানি করে প্রায় গুছিয়ে এনেছিল নতুন দর ঘোষণার প্রস্তুতি। নির্বাহী আদেশে দাম বাড়িয়ে দেয় তৎকালীন সরকার। তারপর আইনও সংশোধন করে বিইআরসির ক্ষমতায় ভাগ বসায় নির্বাহী বিভাগ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইনটি বাতিল করায় একক এখতিয়ার ফিরে পেয়েছে বিইআরসি।
Reporter Name 



















