
শেষ বাঁশি বাজতেই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি লিওনেল মেসি। সতীর্থদের উচ্ছ্বাসের মাঝেও তার চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে। আটলান্টার সেই আবেগঘন মুহূর্তের কারণ ছিল শুধু নাটকীয় জয় নয়, বরং বিশ্বকাপ থেকে অকাল বিদায়ের আশঙ্কা কাটিয়ে ওঠার স্বস্তি। ম্যাচ শেষে নিজেই জানালেন, ০-২ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর মনে হয়েছিল আর্জেন্টিনার স্বপ্ন বুঝি সেখানেই থেমে যাচ্ছে। সেই ভয় কাটিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার আনন্দই তাকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।
ম্যাচ শেষে নিজের কান্নার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমরা যখন ২-০ তে পিছিয়ে পড়লাম, তখন পরিস্থিতি খারাপ মনে হচ্ছিল, কঠিন মনে হচ্ছিল। আর শেষে, একটু আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল, পার পেয়ে যাওয়ার স্বস্তি, বিশ্বকাপে টিকে থাকার স্বস্তি, কারণ আমরা এখনই বিদায় নিতে চাইনি। আমাদের মনে হচ্ছিল লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এবং চেষ্টা করার যোগ্যতা আমাদের এখনও আছে, আর ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে সেটাই হয়েছে।’
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য মেসির জন্য ছিল হতাশার। ১৯ মিনিটে স্পট কিক থেকে সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারেননি তিনি। তাঁর শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। সেই মুহূর্তের হতাশা ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও ভুলতে পারেননি আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।
মিক্সড জোনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘পেনাল্টি মিস করার পর আমি ভীষণ রেগে গিয়েছিলাম নিজের ওপর। যেভাবে আমি শটটা নিয়েছি, তাতে আমার মনে হচ্ছিল, আমি পুরো দলকে ডুবিয়ে দিলাম।’
তবে ম্যাচের গল্প বদলে যায় দ্বিতীয়ার্ধে। ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। একটি গোল করেন মেসি, আরেকটি গোলে রাখেন অবদান।
নাটকীয় এই জয়ের পর কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর ঘুরে দাঁড়ানো সহজ নয়। পরবর্তী রাউন্ডে যেতে পেরে আমি খুশি এবং যেভাবে আমরা এটা করেছি তা নিয়েও। ২-০ হওয়ার পর পরিস্থিতি কঠিন হয়ে গিয়েছিল এবং আবারও ম্যাচটি নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়াটা অনেক রোমাঞ্চকর যাত্রা ছিল।’
আর্জেন্টিনার হার না মানা মানসিকতার প্রশংসাও করেছেন মেসি, ‘এই দলটা আরও একবার প্রমাণ করেছে, যা আমি অনেকবার বলেছি। আর আমি এটা জানি কারণ আমি ওদের চিনি, আমি জানি ওরা কীভাবে কাজ করে। এই গ্রুপটি লড়াই করতে বা বিশ্বাস রাখতে জানে। ওদের পাশে থাকাটাও আমার জন্য একটি সম্মানের বিষয়; আমরা যেকোনো দলের বিরুদ্ধে লড়াই করব।’
দলের লড়াকু মানসিকতা নিয়ে আরেকবার আবেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দলটি যেভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, চেষ্টা করে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমি গর্বিত। তারা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই জয়ে এবং শেষ পর্যন্ত যেভাবে সব সম্পন্ন হলো, তাতে আমি খুবই আনন্দিত।’
ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে লাউতারো মার্তিনেস মাঠে নামার পর ডান প্রান্তে সরে খেলতে দেখা যায় মেসিকে। সেই কৌশলগত পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘মাঝমাঠে খেলাটা কঠিন ছিল কারণ তারা সেখানে ভিড় জমাচ্ছিল। তারা একজন অতিরিক্ত মিডফিল্ডার যোগ করেছিল এবং লাইনগুলোর মাঝে জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। লাউতারো যখন মাঠে নামল, তখন মাঠে ইতোমধ্যে দুজন নম্বর নাইন থাকায় মাঝমাঠে অনেক বেশি খেলোয়াড় হয়ে গিয়েছিল। তাই, আমি সাইডের দিকে একটু জায়গা খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। আমার মনে হয় আমরা সেটা করতে পেরেছি, আর এভাবেই কুতির গোলটি এসেছে এবং শেষ পর্যন্ত ফলাফলে আমি আনন্দিত।’
নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের লড়াইটি তাই শুধু একটি জয় নয়, মেসির জন্য ছিল মানসিক লড়াইয়েও জয়ের গল্প। পেনাল্টি মিসের অপরাধবোধ, দলকে হারিয়ে ফেলার শঙ্কা আর বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের ভয়-সবকিছুকে পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত যে স্বস্তি তিনি পেয়েছেন, সেই স্বস্তির অশ্রুই হয়ে উঠেছে ম্যাচ-পরবর্তী সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্য!
Reporter Name 

















