শিরোনামঃ
আমে চাঙা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, জীবিকায় জড়িত লাখো মানুষ যশোর বেনাপোলে -শার্শা চাহিদা বাড়ছে তালশাঁসের বিজিবির বাধায় ব্যর্থ বিএসএফের পুশ-ইন, শূন্য রেখায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ২৮ জন চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিন উপজেলায় বজ্রপাতে নারীসহ ৫ জনের মৃত্যু চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ২৮ জনকে পুশ-ইন করল বিএসএফ, বিজিবির সতর্ক অবস্থান নাচোলে ৮২দিন পর ইউএনও হিসেবে প্রিয়াংকা দাসের যোগদান চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষি জমির টপসয়েল কাটার অপরাধে এসিল্যান্ডের অভিযান স্কেভেটর ও ৪ ট্রাক্টরের ব্যাটারি জব্দ চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রপাতের পৃথক ঘটনায় নিহত ২ কুয়েত বিমানবন্দরে হামলায় ৪ বাংলাদেশি আহত: দূতাবাস কানসাট বাজারে উঠেছে পর্যাপ্ত আম, ক্রেতা কম
News Title :
আমে চাঙা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, জীবিকায় জড়িত লাখো মানুষ যশোর বেনাপোলে -শার্শা চাহিদা বাড়ছে তালশাঁসের বিজিবির বাধায় ব্যর্থ বিএসএফের পুশ-ইন, শূন্য রেখায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ২৮ জন চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিন উপজেলায় বজ্রপাতে নারীসহ ৫ জনের মৃত্যু চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ২৮ জনকে পুশ-ইন করল বিএসএফ, বিজিবির সতর্ক অবস্থান নাচোলে ৮২দিন পর ইউএনও হিসেবে প্রিয়াংকা দাসের যোগদান চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষি জমির টপসয়েল কাটার অপরাধে এসিল্যান্ডের অভিযান স্কেভেটর ও ৪ ট্রাক্টরের ব্যাটারি জব্দ চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রপাতের পৃথক ঘটনায় নিহত ২ কুয়েত বিমানবন্দরে হামলায় ৪ বাংলাদেশি আহত: দূতাবাস কানসাট বাজারে উঠেছে পর্যাপ্ত আম, ক্রেতা কম

আমে চাঙা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, জীবিকায় জড়িত লাখো মানুষ

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:১৯:১২ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
  • ২৫ Time View
  • চার জেলায় ১২ লাখ টনের উৎপাদন লক্ষ্য
  • আম ঘিরে ১০ হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি
  • মৌসুমে কর্মসংস্থান পাচ্ছেন তিন লাখ মানুষ
  • রপ্তানি বাজারে বাড়ছে বাংলাদেশের আম

গ্রীষ্ম এলেই উত্তরাঞ্চলের জনপদে শুরু হয় এক ভিন্ন ব্যস্ততা। বাগানে বাগানে পাকা-অপাকা আমের সুবাস, মোকামে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়, ট্রাকভর্তি চালান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে রাজশাহী অঞ্চলে এখন আমের উৎসব। তবে এই উৎসব শুধু একটি ফলকে ঘিরে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি, লাখো মানুষের জীবিকা এবং একটি বিস্তৃত বাণিজ্যিক চক্র।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর—এ চার জেলায় প্রায় ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, উৎপাদন, বিপণন, পরিবহন, প্যাকেজিং, কুরিয়ার, ব্যাংকিং, ঝুড়ি শিল্প ও রপ্তানি কার্যক্রম মিলিয়ে কয়েক মাসের এ মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মৌসুমি ফল থেকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি

একসময় আম ছিল কেবল মৌসুমি ফল। কিন্তু গত দুই দশকে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক শিল্পে রূপ নিয়েছে। নতুন জাতের উদ্ভাবন, বাণিজ্যিক বাগানের সম্প্রসারণ, আধুনিক পরিচর্যা ও অনলাইন বাজার ব্যবস্থার কারণে আম এখন শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়; জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

 

 

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, ধান ও আলুর পর এখন আম উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিকল্পিতভাবে আমভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে পারলে সারা বছরই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে জানান তিনি।

উৎপাদনের শীর্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জ

আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে এবারও শীর্ষে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। জেলার প্রায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৫৯ হাজার টন।

বিশেষ করে ফজলি, খিরসাপাত, ল্যাংড়া ও আশ্বিনা জাতের আমের জন্য দেশের অন্যতম পরিচিত অঞ্চল চাঁপাইনবাবগঞ্জ। জেলার কানসাট মোকাম মৌসুম এলেই দেশের বৃহত্তম আম বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

প্রতিদিন এখানে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হচ্ছে, আর জেলাজুড়ে বেচাকেনার পরিমাণ ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার কাছাকাছি। মৌসুমজুড়ে প্রায় দুই থেকে আড়াই মাসব্যাপী চলা এ আম বেচাকেনার বাজারে মোট লেনদেনের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং পুরো মৌসুমে জেলার আম ব্যবসার আকার সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়ে থাকে।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট আমের বাজারে বর্তমানে জাত ও মানভেদে আম ৮০০ টাকা থেকে ২,১০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে আম। হিমসাগর (ক্ষীরশাপাত) ১৭০০ টাকা থেকে শুরু করে ২১০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। লক্ষণভোগ ও গুটি আম ১০০০ থেকে ১৪০০ মণে বিক্রি হচ্ছে।

এছাড়াও কানসাটের আড়তগুলোতে ১ মণের বিপরীতে ৪০ কেজির পরিবর্তে ৫৪ কেজিতে ১ মণ হিসেবে আম কেনা-বেচা হয় বলে চাষিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

 

বিজ্ঞাপন

রপ্তানির সম্ভাবনায় এগোচ্ছে নওগাঁ

নওগাঁ জেলার প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এ বছর প্রায় ৩ লাখ ৮৭ হাজার টন আম উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। এর মধ্যে আম্রপালি ৭৬ শতাংশ, আশ্বিনা ৭ শতাংশ, বারি-৪ আম ৬ শতাংশ, ফজলি ৩ শতাংশ, ল্যাংড়া ৩ শতাংশ, ক্ষীরসাপাত ২ শতাংশ, গৌরমতি ১ শতাংশ, কাটিমন ১ শতাংশ এবং অন্য জাতের ১ শতাংশ জমিতে আমের বাগান রয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ১২ মেট্রিক টন। সে হিসেবে প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৩৫ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু নওগাঁতেই প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে। গত বছর মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১০০ টন আম রপ্তানি হয়েছিল। এবার সেই পরিমাণ দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

 

এবার বিশ্বের আটটি দেশে আম রপ্তানি হবে। দেশগুলো হলো- যুক্তরাজ্য, ইতালি, সুইডেন, জার্মানি, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান। এসব দেশে ১০০ মেট্রিক টন আমের চাহিদা রয়েছে। গত বছর ১৫ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানি হয়েছিল।

বিগত বছরগুলোতে এই জেলা থেকে প্রতি মৌসুমে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ মেট্রিক টন আম রপ্তানি হয়েছে। ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রায় ২০০ মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ মৌসুমে ২২৫ মেট্রিক টন এবং ২০২৪-২৫ সালে ২২৭ মেট্রিক টন আম সরাসরি বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এবার এ জেলা থেকে ২৫০ মেট্রিক টন বিদেশে রপ্তানি হতে পারে বলে জানান তিনি।

 

 

রাজশাহীর মোকামে জমজমাট বেচাকেনা

রাজশাহীতে এ বছর প্রায় ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্য প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার টন। বাঘা উপজেলা জেলার সবচেয়ে বড় আম উৎপাদন এলাকা। এছাড়া চারঘাট, গোদাগাড়ী, পুঠিয়া, বাগমারা ও দুর্গাপুরেও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে আমচাষ।

রাজশাহীর বানেশ্বর ও বাঘার মোকামগুলোতে এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আম কেনা-বেচা চলছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে অবস্থান করছেন এসব মোকামে।

গোদাগাড়ীর চাষি আব্দুর রহিম সাগর ৫০ একর জমিতে আম চাষ করেছেন। এবার তিনি এক কোটি টাকার আম বিক্রির আশা করছেন। তিনি বলেন, ‘ফলন ভালো হয়েছে। বাজারদর অনুকূলে থাকলে এবার লাভবান হওয়ার আশা করছি।’

আব্দুর রাজ্জাক নামের একজন আমচাষি জাগো নিউজকে বলেন, ‘চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমের ফলন তুলনামূলক ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভালো দাম পাবো বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু বাজারে দাম নেই।’

নাটোরেও বাড়ছে আমের আবাদ

নাটোরে চলতি মৌসুমে প্রায় ৫ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬৮ হাজার টন। জেলার লালপুর, বাগাতিপাড়া ও আশপাশের এলাকায় দ্রুত বাড়ছে বাণিজ্যিক আমচাষ। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ বছর নাটোরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে।

আমের সঙ্গে জড়িয়ে তিন লাখ মানুষের জীবিকা

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের মৌসুমকে ঘিরে গড়ে ওঠে বিশাল মৌসুমি অর্থনীতি। বাগানের শ্রমিক, ঝুড়ি কারিগর, ট্রাকচালক, পরিবহন শ্রমিক, কুরিয়ার কর্মী, আড়তদার ও প্যাকেজিং কর্মী মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান।

আম সংগ্রহ, বাছাই ও প্যাকিংয়ে নিয়োজিত শ্রমিকরা প্রতিদিন এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। একই সঙ্গে ঝুড়ি ও প্যাকেজিং শিল্প, পরিবহন খাত এবং কুরিয়ার সেবার সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষও মৌসুমে অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ পান। ফলে আম শুধু একটি ফল নয়, বরং এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

গোদাগাড়ী উপজেলার আমবাগানের শ্রমিক নির্জর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘আমের মৌসুমে আমাদের প্রচুর কাজ থাকে। সারা বছর নিয়মিত কাজ পাওয়া যায় না, কিন্তু আমের সময়ে বাগানে আম পাড়া, বাছাই ও প্যাকিংয়ের কাজ করে ভালো আয় করা যায়। এই মৌসুমের আয়ের ওপরই অনেকটা নির্ভর করে পরিবারের খরচ চালাই।’

কৃষকের লাভ কত?

আমকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠলেও এর প্রকৃত সুফল অনেক ক্ষেত্রে পান না কৃষকরা। কৃষকদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদারদের দৌরাত্ম্যের কারণে তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

চাষিদের মতে, এক মণ আম উৎপাদনে গড়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হয়। এছাড়া পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে বছরে পাঁচ থেকে ছয়বার স্প্রে করতে হয়, যেখানে প্রতি বিঘা বাগানে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। সার, সেচ ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যায়। একটি বিঘা জমিতে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ মণ আম উৎপাদিত হলেও মৌসুমে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যায়, ফলে অনেক কৃষক প্রত্যাশিত লাভ পান না।

 

এদিকে আম বেচাকেনায় ৫৪ কেজিকে এক মণ ধরা হওয়ায় কৃষকদের অতিরিক্ত ওজন দিতে হয়। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কম দাম এবং ওজনের এ পদ্ধতির কারণে আমচাষে পরিশ্রমের তুলনায় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের।

গোদাগাড়ী আম চাষি নজরুল ভুঁইয়া বলেন, এক বিঘা আম চাষে ২৫-৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। সেখানে আম উৎপাদন হয় বিঘা প্রতি ৪০-৫০ মণ। আম বেচাকেনায় ৫৪ কেজিকে এক মণ ধরায় কৃষকদের অতিরিক্ত ১৪ কেজি বেশি দিতে হয়। ফলে অনেক সময় লোকসানেও পড়তে হয়। তাছাড়া বাজার সিন্ডিকেট-এর কারণে অনেক সময় আমের দামও তেমন থাকে না বলে জানান তিনি।

মূল্য নির্ধারণে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব

আমের বাগান থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে একাধিক স্তরের ব্যবসায়ীর হাত ঘুরতে হয়। সাধারণত কৃষকের কাছ থেকে ফড়িয়া বা সংগ্রহকারী আম কেনেন। পরে তা আড়তদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে বাজারজাত হয়। এই দীর্ঘ বিপণন ব্যবস্থার কারণে বাগান পর্যায়ের দাম ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক যে দামে আম বিক্রি করেন, ভোক্তাকে সেই আম কিনতে হয় দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে।

কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতে বাজারে আমের সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম নির্ধারণে তাদের কোনো ভূমিকা থাকে না। দ্রুত আম বিক্রি করতে না পারলে পচনের ঝুঁকি থাকায় তারা কম দামেও আম বিক্রি করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদাররা বাজার পরিস্থিতি, সংরক্ষণ সুবিধা ও ক্রেতা নেটওয়ার্কের সুবিধা নিয়ে বেশি মুনাফা করেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আমের মূল্য শৃঙ্খলে কৃষকের তুলনায় খুচরা বিক্রেতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফার হার বেশি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা জানান, বাগানে দাম কম থাকলেও রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে পরিবহন খরচ, কমিশন, আড়ত ব্যয় ও একাধিক হাত বদলের কারণে খুচরা মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে উৎপাদনের পুরো ঝুঁকি কৃষক বহন করলেও শেষ বাজারমূল্যের বড় অংশ চলে যায় মধ্যবর্তী ব্যবসায়ী পর্যায়ে।

রপ্তানি বাড়াতে প্রয়োজন মান নিয়ন্ত্রণ

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আমের চাহিদা বাড়লেও রপ্তানির পরিমাণ এখনও সম্ভাবনার তুলনায় কম। রপ্তানি বাড়াতে হলে উৎপাদন থেকে শুরু করে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হবে।

রাজশাহীর আম বর্তমানে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে বিপুল উৎপাদন সত্ত্বেও রপ্তানির পরিমাণ এখনও খুবই সীমিত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানের কোল্ড চেইন সুবিধার অভাব, গ্লোবাল জিএপি সনদের স্বল্পতা, উন্নত প্যাকেজিং ও গ্রেডিং ব্যবস্থার ঘাটতি, উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং ফাইটোস্যানিটারি শর্ত পূরণের জটিলতা বাংলাদেশের আম রপ্তানির প্রধান বাধা। এসব সমস্যা দূর করা গেলে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বিশ্ববাজারে আরও বড় অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক মানের সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে আমচাষিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং রপ্তানি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নতুন রেকর্ডের আশা

কৃষিবিদদের মতে, এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে। তবে মৌসুমের বাকি সময়ে শিলাবৃষ্টি, কালবৈশাখি কিংবা অতিবৃষ্টি বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

 

এ বিষয়ে রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমের মৌসুমে তাপপ্রবাহ, কালবৈশাখী ঝড় ও আকস্মিক ভারী বৃষ্টি সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। বিশেষ করে গুটি ও পরিপক্ব অবস্থায় ঝড়-বৃষ্টি হলে ফল ঝরে পড়তে পারে। তবে আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এ বছর আমের উৎপাদন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার নাম আম

সবকিছু মিলিয়ে আম এখন আর শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক খাত। কয়েক মাসের এই মৌসুমি বাণিজ্য কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, পরিবহন খাত ও অসংখ্য সেবা খাতকে সচল রাখে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত উৎপাদন, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ সম্ভব হলে আমভিত্তিক অর্থনীতি উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে চলতি মৌসুমে উৎপাদন ও বাণিজ্যে নতুন রেকর্ড গড়ারও আশা করছেন তারা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

Categories

আমে চাঙা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, জীবিকায় জড়িত লাখো মানুষ

আমে চাঙা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, জীবিকায় জড়িত লাখো মানুষ

Update Time : ১০:১৯:১২ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
  • চার জেলায় ১২ লাখ টনের উৎপাদন লক্ষ্য
  • আম ঘিরে ১০ হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি
  • মৌসুমে কর্মসংস্থান পাচ্ছেন তিন লাখ মানুষ
  • রপ্তানি বাজারে বাড়ছে বাংলাদেশের আম

গ্রীষ্ম এলেই উত্তরাঞ্চলের জনপদে শুরু হয় এক ভিন্ন ব্যস্ততা। বাগানে বাগানে পাকা-অপাকা আমের সুবাস, মোকামে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়, ট্রাকভর্তি চালান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে রাজশাহী অঞ্চলে এখন আমের উৎসব। তবে এই উৎসব শুধু একটি ফলকে ঘিরে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি, লাখো মানুষের জীবিকা এবং একটি বিস্তৃত বাণিজ্যিক চক্র।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর—এ চার জেলায় প্রায় ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, উৎপাদন, বিপণন, পরিবহন, প্যাকেজিং, কুরিয়ার, ব্যাংকিং, ঝুড়ি শিল্প ও রপ্তানি কার্যক্রম মিলিয়ে কয়েক মাসের এ মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মৌসুমি ফল থেকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি

একসময় আম ছিল কেবল মৌসুমি ফল। কিন্তু গত দুই দশকে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক শিল্পে রূপ নিয়েছে। নতুন জাতের উদ্ভাবন, বাণিজ্যিক বাগানের সম্প্রসারণ, আধুনিক পরিচর্যা ও অনলাইন বাজার ব্যবস্থার কারণে আম এখন শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়; জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

 

 

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, ধান ও আলুর পর এখন আম উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিকল্পিতভাবে আমভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে পারলে সারা বছরই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে জানান তিনি।

উৎপাদনের শীর্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জ

আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে এবারও শীর্ষে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। জেলার প্রায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৫৯ হাজার টন।

বিশেষ করে ফজলি, খিরসাপাত, ল্যাংড়া ও আশ্বিনা জাতের আমের জন্য দেশের অন্যতম পরিচিত অঞ্চল চাঁপাইনবাবগঞ্জ। জেলার কানসাট মোকাম মৌসুম এলেই দেশের বৃহত্তম আম বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

প্রতিদিন এখানে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হচ্ছে, আর জেলাজুড়ে বেচাকেনার পরিমাণ ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার কাছাকাছি। মৌসুমজুড়ে প্রায় দুই থেকে আড়াই মাসব্যাপী চলা এ আম বেচাকেনার বাজারে মোট লেনদেনের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং পুরো মৌসুমে জেলার আম ব্যবসার আকার সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়ে থাকে।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট আমের বাজারে বর্তমানে জাত ও মানভেদে আম ৮০০ টাকা থেকে ২,১০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে আম। হিমসাগর (ক্ষীরশাপাত) ১৭০০ টাকা থেকে শুরু করে ২১০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। লক্ষণভোগ ও গুটি আম ১০০০ থেকে ১৪০০ মণে বিক্রি হচ্ছে।

এছাড়াও কানসাটের আড়তগুলোতে ১ মণের বিপরীতে ৪০ কেজির পরিবর্তে ৫৪ কেজিতে ১ মণ হিসেবে আম কেনা-বেচা হয় বলে চাষিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

 

বিজ্ঞাপন

রপ্তানির সম্ভাবনায় এগোচ্ছে নওগাঁ

নওগাঁ জেলার প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এ বছর প্রায় ৩ লাখ ৮৭ হাজার টন আম উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। এর মধ্যে আম্রপালি ৭৬ শতাংশ, আশ্বিনা ৭ শতাংশ, বারি-৪ আম ৬ শতাংশ, ফজলি ৩ শতাংশ, ল্যাংড়া ৩ শতাংশ, ক্ষীরসাপাত ২ শতাংশ, গৌরমতি ১ শতাংশ, কাটিমন ১ শতাংশ এবং অন্য জাতের ১ শতাংশ জমিতে আমের বাগান রয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ১২ মেট্রিক টন। সে হিসেবে প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৩৫ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু নওগাঁতেই প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে। গত বছর মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১০০ টন আম রপ্তানি হয়েছিল। এবার সেই পরিমাণ দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

 

এবার বিশ্বের আটটি দেশে আম রপ্তানি হবে। দেশগুলো হলো- যুক্তরাজ্য, ইতালি, সুইডেন, জার্মানি, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান। এসব দেশে ১০০ মেট্রিক টন আমের চাহিদা রয়েছে। গত বছর ১৫ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানি হয়েছিল।

বিগত বছরগুলোতে এই জেলা থেকে প্রতি মৌসুমে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ মেট্রিক টন আম রপ্তানি হয়েছে। ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রায় ২০০ মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ মৌসুমে ২২৫ মেট্রিক টন এবং ২০২৪-২৫ সালে ২২৭ মেট্রিক টন আম সরাসরি বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এবার এ জেলা থেকে ২৫০ মেট্রিক টন বিদেশে রপ্তানি হতে পারে বলে জানান তিনি।

 

 

রাজশাহীর মোকামে জমজমাট বেচাকেনা

রাজশাহীতে এ বছর প্রায় ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্য প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার টন। বাঘা উপজেলা জেলার সবচেয়ে বড় আম উৎপাদন এলাকা। এছাড়া চারঘাট, গোদাগাড়ী, পুঠিয়া, বাগমারা ও দুর্গাপুরেও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে আমচাষ।

রাজশাহীর বানেশ্বর ও বাঘার মোকামগুলোতে এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আম কেনা-বেচা চলছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে অবস্থান করছেন এসব মোকামে।

গোদাগাড়ীর চাষি আব্দুর রহিম সাগর ৫০ একর জমিতে আম চাষ করেছেন। এবার তিনি এক কোটি টাকার আম বিক্রির আশা করছেন। তিনি বলেন, ‘ফলন ভালো হয়েছে। বাজারদর অনুকূলে থাকলে এবার লাভবান হওয়ার আশা করছি।’

আব্দুর রাজ্জাক নামের একজন আমচাষি জাগো নিউজকে বলেন, ‘চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমের ফলন তুলনামূলক ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভালো দাম পাবো বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু বাজারে দাম নেই।’

নাটোরেও বাড়ছে আমের আবাদ

নাটোরে চলতি মৌসুমে প্রায় ৫ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬৮ হাজার টন। জেলার লালপুর, বাগাতিপাড়া ও আশপাশের এলাকায় দ্রুত বাড়ছে বাণিজ্যিক আমচাষ। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ বছর নাটোরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে।

আমের সঙ্গে জড়িয়ে তিন লাখ মানুষের জীবিকা

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের মৌসুমকে ঘিরে গড়ে ওঠে বিশাল মৌসুমি অর্থনীতি। বাগানের শ্রমিক, ঝুড়ি কারিগর, ট্রাকচালক, পরিবহন শ্রমিক, কুরিয়ার কর্মী, আড়তদার ও প্যাকেজিং কর্মী মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান।

আম সংগ্রহ, বাছাই ও প্যাকিংয়ে নিয়োজিত শ্রমিকরা প্রতিদিন এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। একই সঙ্গে ঝুড়ি ও প্যাকেজিং শিল্প, পরিবহন খাত এবং কুরিয়ার সেবার সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষও মৌসুমে অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ পান। ফলে আম শুধু একটি ফল নয়, বরং এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

গোদাগাড়ী উপজেলার আমবাগানের শ্রমিক নির্জর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘আমের মৌসুমে আমাদের প্রচুর কাজ থাকে। সারা বছর নিয়মিত কাজ পাওয়া যায় না, কিন্তু আমের সময়ে বাগানে আম পাড়া, বাছাই ও প্যাকিংয়ের কাজ করে ভালো আয় করা যায়। এই মৌসুমের আয়ের ওপরই অনেকটা নির্ভর করে পরিবারের খরচ চালাই।’

কৃষকের লাভ কত?

আমকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠলেও এর প্রকৃত সুফল অনেক ক্ষেত্রে পান না কৃষকরা। কৃষকদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদারদের দৌরাত্ম্যের কারণে তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

চাষিদের মতে, এক মণ আম উৎপাদনে গড়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হয়। এছাড়া পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে বছরে পাঁচ থেকে ছয়বার স্প্রে করতে হয়, যেখানে প্রতি বিঘা বাগানে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। সার, সেচ ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যায়। একটি বিঘা জমিতে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ মণ আম উৎপাদিত হলেও মৌসুমে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যায়, ফলে অনেক কৃষক প্রত্যাশিত লাভ পান না।

 

এদিকে আম বেচাকেনায় ৫৪ কেজিকে এক মণ ধরা হওয়ায় কৃষকদের অতিরিক্ত ওজন দিতে হয়। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কম দাম এবং ওজনের এ পদ্ধতির কারণে আমচাষে পরিশ্রমের তুলনায় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের।

গোদাগাড়ী আম চাষি নজরুল ভুঁইয়া বলেন, এক বিঘা আম চাষে ২৫-৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। সেখানে আম উৎপাদন হয় বিঘা প্রতি ৪০-৫০ মণ। আম বেচাকেনায় ৫৪ কেজিকে এক মণ ধরায় কৃষকদের অতিরিক্ত ১৪ কেজি বেশি দিতে হয়। ফলে অনেক সময় লোকসানেও পড়তে হয়। তাছাড়া বাজার সিন্ডিকেট-এর কারণে অনেক সময় আমের দামও তেমন থাকে না বলে জানান তিনি।

মূল্য নির্ধারণে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব

আমের বাগান থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে একাধিক স্তরের ব্যবসায়ীর হাত ঘুরতে হয়। সাধারণত কৃষকের কাছ থেকে ফড়িয়া বা সংগ্রহকারী আম কেনেন। পরে তা আড়তদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে বাজারজাত হয়। এই দীর্ঘ বিপণন ব্যবস্থার কারণে বাগান পর্যায়ের দাম ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক যে দামে আম বিক্রি করেন, ভোক্তাকে সেই আম কিনতে হয় দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে।

কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতে বাজারে আমের সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম নির্ধারণে তাদের কোনো ভূমিকা থাকে না। দ্রুত আম বিক্রি করতে না পারলে পচনের ঝুঁকি থাকায় তারা কম দামেও আম বিক্রি করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদাররা বাজার পরিস্থিতি, সংরক্ষণ সুবিধা ও ক্রেতা নেটওয়ার্কের সুবিধা নিয়ে বেশি মুনাফা করেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আমের মূল্য শৃঙ্খলে কৃষকের তুলনায় খুচরা বিক্রেতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফার হার বেশি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা জানান, বাগানে দাম কম থাকলেও রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে পরিবহন খরচ, কমিশন, আড়ত ব্যয় ও একাধিক হাত বদলের কারণে খুচরা মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে উৎপাদনের পুরো ঝুঁকি কৃষক বহন করলেও শেষ বাজারমূল্যের বড় অংশ চলে যায় মধ্যবর্তী ব্যবসায়ী পর্যায়ে।

রপ্তানি বাড়াতে প্রয়োজন মান নিয়ন্ত্রণ

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আমের চাহিদা বাড়লেও রপ্তানির পরিমাণ এখনও সম্ভাবনার তুলনায় কম। রপ্তানি বাড়াতে হলে উৎপাদন থেকে শুরু করে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হবে।

রাজশাহীর আম বর্তমানে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে বিপুল উৎপাদন সত্ত্বেও রপ্তানির পরিমাণ এখনও খুবই সীমিত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানের কোল্ড চেইন সুবিধার অভাব, গ্লোবাল জিএপি সনদের স্বল্পতা, উন্নত প্যাকেজিং ও গ্রেডিং ব্যবস্থার ঘাটতি, উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং ফাইটোস্যানিটারি শর্ত পূরণের জটিলতা বাংলাদেশের আম রপ্তানির প্রধান বাধা। এসব সমস্যা দূর করা গেলে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বিশ্ববাজারে আরও বড় অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক মানের সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে আমচাষিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং রপ্তানি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নতুন রেকর্ডের আশা

কৃষিবিদদের মতে, এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে। তবে মৌসুমের বাকি সময়ে শিলাবৃষ্টি, কালবৈশাখি কিংবা অতিবৃষ্টি বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

 

এ বিষয়ে রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমের মৌসুমে তাপপ্রবাহ, কালবৈশাখী ঝড় ও আকস্মিক ভারী বৃষ্টি সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। বিশেষ করে গুটি ও পরিপক্ব অবস্থায় ঝড়-বৃষ্টি হলে ফল ঝরে পড়তে পারে। তবে আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এ বছর আমের উৎপাদন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার নাম আম

সবকিছু মিলিয়ে আম এখন আর শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক খাত। কয়েক মাসের এই মৌসুমি বাণিজ্য কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, পরিবহন খাত ও অসংখ্য সেবা খাতকে সচল রাখে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত উৎপাদন, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ সম্ভব হলে আমভিত্তিক অর্থনীতি উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে চলতি মৌসুমে উৎপাদন ও বাণিজ্যে নতুন রেকর্ড গড়ারও আশা করছেন তারা।