
বরেন্দ্র অঞ্চলে পুরোদমে চলছে আমন ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ। মাঠজুড়ে সোনালী ধানের সমারোহ আর কৃষকদের ব্যস্ততায় তৈরি হয়েছে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে এই ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে আছে উদ্বেগ, উৎপাদন ভালো হলেও বাড়তি খরচ ও বাজার দামের অনিশ্চয়তা কৃষকদের ভাবাচ্ছে।
বিভিন্ন উপজেলার মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। অনেকেই আধুনিক মেশিন ব্যবহার করে ধান মাড়াই করছেন, ফলে সময় ও শ্রম কিছুটা কমলেও খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি খড়ের ভালো দামের কারণে কিছুটা অতিরিক্ত আয় হলেও তা সামগ্রিক ব্যয় সামাল দিতে যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন অনেকেই।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ বছর আমন ধানের ফলন সন্তোষজনক। প্রতি বিঘায় গড়ে ২০ থেকে ২৩ মণ পর্যন্ত ধান পাওয়া যাচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কৃষকরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে চাষাবাদে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সার সংকট দেখা দেওয়ায় তাদের অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার সংগ্রহ করতে হয়েছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কৃষক আব্দুল করিম বলেন, ধানের দামের চেয়ে সারের দাম বেশি হয়ে গেছে। একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে ধানের দাম তুলনামূলক কম, এভাবে চললে কৃষক টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকট নতুন নয়, তবে এ বছর তা আরও প্রকট হয়েছে। একসঙ্গে অধিকাংশ কৃষক ধান কাটায় শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।
ফলে শ্রমিকদের মজুরি বেড়ে গিয়ে কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে বেশি মজুরিতে শ্রমিক নিয়োগ করছেন, আবার কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করছেন।
কৃষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সময়মতো পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে ভবিষ্যৎ মৌসুমে কৃষিকাজ ব্যাহত হতে পারে। সেচনির্ভর এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে সেচ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে, যা সরাসরি উৎপাদনে প্রভাব ফেলে।
একাধিক কৃষক জানান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে আগামী মৌসুমে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হবে। কিছু এলাকায় ‘কারেন্ট পোকা’র আক্রমণে ধানের আংশিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। যদিও সামগ্রিকভাবে ফলন ভালো হয়েছে, তবে এই ধরনের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকায়। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় এই দাম যথেষ্ট নয়। তারা বলছেন, যদি বাজারে ধানের দাম আরও না বাড়ে, তাহলে ভালো ফলন হলেও প্রকৃত লাভের মুখ দেখা কঠিন হবে। ফলে অনেক কৃষক ভবিষ্যতে ধান চাষ থেকে সরে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াসিন আলি জানান, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, সময়মতো সার প্রয়োগ ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় এ বছর ভালো ফলন সম্ভব হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় বোরো আবাদ হয়েছিল ৪৭ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা আছে ২ লাখ ৩১ হাজার মেট্রিকটন। এখন কাটা হয়েছে ১০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ধান। কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে এবং উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
Reporter Name 



















