
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পদ্মা নদীতীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন। গত এক মাসে পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক বসতবাড়ি, শতাধিক বিঘা আবাদি জমি, আম ও বাঁশবাগানসহ অসংখ্য গাছপালা। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের গমের চর গ্রামে আরও তিনটি বাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। ভাঙনের আতঙ্কে প্রতিদিনই বসতভিটা সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন নদীতীরের মানুষ।
শনিবার সরেজমিনে গমের চর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নদীর তীব্র স্রোতে একের পর এক ভেঙে পড়ছে নদীতীর। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কেউ আবার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
ভাঙনের মুখে বাড়ি সরাতে বাধ্য হওয়া গ্রামের বাসিন্দা বিপ্লব বলেন, জানি না সৃষ্টিকর্তা কপালে কী লিখে রেখেছেন। কোথায় যাব, কী খাব, কিছুই বুঝতে পারছি না। যেন জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছি।
একই গ্রামের শহিদুল বলেন, বুধবারও নদী কিছুটা দূরে ছিল। ভাবতেই পারিনি বৃহস্পতিবারই বাড়ি সরাতে হবে। আপাতত ঘর খুলে একটু দূরে রেখেছি। কিন্তু স্থায়ীভাবে কোথায় যাব, এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।
এরফান আলী বলেন, এক কষ্ট নিয়ে আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু আল্লাহ যা ভালো মনে করেন, তাই মেনে নিতে হচ্ছে। ঘরবাড়ি সরিয়ে রেখেছি। আগামীকাল যেখানে হোক চলে যেতে হবে।
গমের চর গ্রামের বাসিন্দা মো. একরামুল হক (৬৬) বলেন, তাঁর জীবনে অন্তত ২০ বার পদ্মার ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। দুই বছর আগে সর্বশেষ বাড়ি ভেঙেছিল। এবার বর্ষার শুরুতেই আবারও ভাঙন শুরু হওয়ায় নতুন করে ঘরবাড়ি সরাতে হচ্ছে।
একই এলাকার সরদারপাড়া গ্রামের জোবদুল হক (৬০) বলেন, গত বছর বাড়ি হারিয়ে নতুন জায়গায় বসতি গড়েছিলেন। এবার আবারও নদীভাঙনের কবলে পড়ে ঘর সরাতে হচ্ছে। এতে তিনি পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ অঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারই জীবনে অন্তত ২০ থেকে ২৫ বার নদীভাঙনের কারণে বসতভিটা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
গমের চর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য তরিকুল ইসলাম বলেন, ভাঙনের কারণে ঘরবাড়ি সরানো যেন এখন তাদের জীবনের স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতি বছরই বসতভিটা হারাতে হচ্ছে। এবারও ঘর সরাতে হয়েছে। এমনকি বসতভিটার জমিও পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু তাঁর নয়, গ্রামের শত শত মানুষের একই অবস্থা।
স্থানীয়দের দাবি, ভারতের গঙ্গা নদী বাংলাদেশের দুর্লভপুর ইউনিয়নে প্রবেশ করে পদ্মা নাম ধারণ করেছে। সেই মোহনা থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে রয়েছে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ। ভারী বর্ষা ও পাহাড়ি ঢলের সময় ফারাক্কার শতাধিক গেট খুলে দিলে পদ্মার স্রোত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তখনই শুরু হয় ভয়াবহ নদীভাঙন। তবে গত কয়েক বছরে ভাঙনের ধরনও বদলে গেছে। অতিবৃষ্টি বা বন্যা ছাড়াও আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত টানা ভাঙন চলতে থাকায় আতঙ্কে রয়েছেন নদীতীরের বাসিন্দারা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, শিবগঞ্জ উপজেলার পদ্মা নদীর পূর্বপাড়ে ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের ৭৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদন হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ঠিকাদার মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করবেন। পরবর্তীতে নদীর পশ্চিম তীরেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পর্যায়ক্রমে পদ্মার দুই তীরেই স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে মানুষের নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, পদ্মা নদীতীরবর্তী শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা, দুর্লভপুর ও উজিরপুর ইউনিয়নে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে হাজারো পরিবারের বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, কবরস্থান ও ঈদগাহ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ সময় অন্তত ৫০০ পরিবার এলাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। শুধু পাঁকা ইউনিয়নেই বিলীন হয়েছে অন্তত ১৫টি গ্রাম এবং প্রায় এক হাজার হেক্টর আবাদি জমি। পাঁচ বছরে এ অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা বলে স্থানীয়দের দাবি।
বর্তমানে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ৫০টি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পাঁচটি বিজিবি ক্যাম্প, একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, চারটি হাট-বাজার, তিনটি কবরস্থান এবং কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে চলতি বর্ষায় আরও বিস্তীর্ণ এলাকা পদ্মার গর্ভে বিলীন হতে পারে।
Reporter Name 


















